‘নিরব শিক্ষা-সংস্কৃতির একজন সক্রিয় শিক্ষক অধ্যাপক সরোজ সিংহ হাজারী| নিভৃতে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে গেছেন| তিনি একজন সন্ত মানুষ| এ ধরনের মানুষদের নিয়ে বারবার আলাপ বা মূল্যায়ন হওয়া দরকার|’ গত ২১ মে ২০২৬ বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট চট্টগ্রামের গ্যালারি হলে খড়িমাটি-এর উদ্যোগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রয়াসন বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির সাবেক উপাচার্য ও রসায়নবিদ ড. সরোজ কান্তি সিংহ হাজারী রচিত আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে বক্তারা একথা বলেন|
তাঁরা আরো বলেন, ‘বিজ্ঞান শিক্ষাকে সহজ করবার জন্য অধ্যাপক সরোজ হাজারী প্রচুর গ্রন্থ রচনা করেছেন| শিক্ষার্থীদের গবেষণা-অধ্যয়নে তিনি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন| আজ দেশের প্রচুর প্রতিষ্ঠানে তার ছাত্রদের ভূমিকায় দেশের শিক্ষাকে সমৃদ্ধ করেছে|’
অনুষ্ঠানে ‘জার্মানি : আমার পড়াশোনা ও বিচিত্র কিছু অভিজ্ঞতা’, ‘আমার শিক্ষা ও শিক্ষক জীবন : অবিশ্বাস্য কিছু অভিজ্ঞতা’ ও ‘বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটিতে উপাচার্য পদের দিনগুলো’ তিনটি বইয়ের ওপর আলোচনা ও পাঠ উন্মোচন হয়| এতে আলোচনা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. তাপসী ঘোষ রায়, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সচিব, থিয়েটার ইনস্টিটটিউট চট্টগ্রামের পরিচালক, নাট্যজন ও কবি অভীক ওসমান ও বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির প্রাক্তন রেজিস্টার আখতারুজ্জামান কায়সার| এ সময় উত্তরীয় দিয়ে অতিথিদের বরণ করে নেন নাট্যজন ও অধ্যাপক অরূপ বড়ুয়া| খড়িমাটি সম্পাদক কবি মনিরুল মনিরের সঞ্চালনায় শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন কবি ও সাংবাদিক নাজিমুদ্দীন শ্যামল, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ডেপুটি রেজিস্টার সালাউদ্দিন শাহরিয়ার, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটির ফার্মেসি বিভাগের প্রাক্তন সভাপতি ড. অনিন্দ্য কুমার নাথ, ইউএসটিসির ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. এম ডি জিয়াউদ্দীন ও ইউএসটিসির ফার্মেসি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মাইকেল দত্ত|
উল্লেখ্য, ড. সরোজ কান্তি সিংহ হাজারী ১৯৪৭ সনের ১ ডিসেম্বর চট্টগ্রামের দোহাজারীতে জন্মগ্রহণ করেন| ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে মাস্টার ডিগ্রি অর্জনের কয়েকদিন পরেই ১৯৭০ সনের ১৫ মে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন| ১৯৭৩ সনে উচ্চ শিক্ষার্থে জার্মানি গমন করেন| ভারত উপমহাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশের মাস্টার ডিগ্রি জার্মানিতে স্বীকৃত নয়| তাই এ সকল দেশের মাস্টার ডিগ্রিধারীদের ৭-৮ বছর পড়াশোনা করে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে হয়| কিন্তু সরোজ হাজারী বার্লিন টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে বিশেষ পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন এবং তার ফলাফলের ভিত্তিতে সরাসরি ডক্টরেট কোর্সে ভর্তি হন| আড়াই বৎসরে ‘খুব ভালো’ ক্যাটাগরিতে (১ম শ্রেণির তুল্য) ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন| জার্মানি হতে ফিরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পাশাপাশি গবেষণাকর্মে নিয়োজিত হন| অনেক এম.এসসি, এম.পিল ও পিএইচ.ডি ছাত্রদের গবেষণা তত্ত্বাবধান করেন| পরবর্তীকালে ইংল্যান্ডের এক্সেটার ইউনিভার্সিটিতে এক বৎসর; জাপানের টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে ছয় মাস, জার্মানির হামবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে তিনবার ও জার্মানির ফ্রেডরিক-শিলার ইউনিভার্সিটি, জেনাতে একবার পোস্ট ডক্টরেল গবেষণা করেন| গবেষণা কর্ম ছাড়াও পুস্তক রচনায় তিনি অবদান রেখেছেন| তিনিই প্রথমে বাংলা ভাষায় উচ্চস্তরে সাফল্যজনকভাবে অনেক পুস্তক রচনা করেন| পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে পুস্তক রচনা করেন|
১৯৮২ হতে ১৯৮৫ পর্যন্ত তিন বৎসর তিনি রসায়ন বিভাগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন| চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়নের শিক্ষক থাকাকালীন অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে জার্মান ভাষা শিক্ষক ছিলেন| ২০১৩ সনের ১ জুলাই তিনি অধ্যাপক হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অবসর নেন| ২০০৯ সনের ১৭ মার্চ বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন| পরবর্তীতে আরো দুই মেয়াদে উপাচার্যের পদে নিয়োগ পান| দেশ ভ্রমণ তার শখ| তিনি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইংল্যান্ড, জার্মানি, জাপান, সুইডেনসহ প্রায় ৩০টি দেশে ভ্রমণ করেছেন|
