মঙ্গলবার, জুন ২, ২০২৬

তোফায়েল আহমেদ : ছাত্রনেতা থেকে জননেতা — এক দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রার অবসান

শিশির পারিয়াল

বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম সংগঠক এবং প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদ-এর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ জুন রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮২ বছর। দীর্ঘ ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন।

 বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতির কিংবদন্তি
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলা জেলার কোরালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি নেতৃত্বের গুণাবলি প্রদর্শন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তিনি ডাকসুর (DUCSU) সহ-সভাপতি (ভিপি) নির্বাচিত হন এবং ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতা হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তাঁর নাম বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছে আরেকটি কারণে। ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণসমাবেশে তিনি জাতির নেতা শেখ মুজিবুর রহমান-কে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করার ঘোষণা দেন, যা পরবর্তীতে ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়।

মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক
১৯৭০ সালের নির্বাচনে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অন্যতম সংগঠক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশ লিবারেশন ফ্রন্ট বা ‘মুজিব বাহিনী’র অন্যতম শীর্ষ নেতৃত্বে ছিলেন। স্বাধীনতার সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা তাঁকে জাতীয় রাজনীতিতে স্থায়ী মর্যাদা এনে দেয়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান তোফায়েল আহমেদ। প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন এই পদে থেকে তিনি নবগঠিত রাষ্ট্রের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করার কাজে অংশ নেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে গেলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রায় ৩৩ মাস কারাবাসসহ বিভিন্ন সময়ে তিনি একাধিকবার রাজনৈতিক কারণে কারাগারে যান। সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।

সংসদ ও মন্ত্রিসভায় দীর্ঘ পথচলা
তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তিনি মোট নয়বার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ভোলা অঞ্চলের মানুষের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে ওঠেন।

তিনি বিভিন্ন সময়ে শিল্পমন্ত্রী ও বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। বিশেষ করে বাণিজ্য খাতের নীতি নির্ধারণ, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য বলে বিবেচিত হয়। সংসদে তাঁর যুক্তিনির্ভর বক্তব্য, অভিজ্ঞতা এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা তাঁকে সব দলের কাছেই একজন সম্মানিত সংসদ সদস্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

রাজনীতির ভদ্রলোক
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান মেরুকরণের মধ্যেও তোফায়েল আহমেদ ছিলেন তুলনামূলকভাবে সংযত ও পরিমিত ভাষার একজন নেতা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতিও তিনি ব্যক্তিগত সৌজন্য বজায় রাখতেন। তাঁর বক্তৃতায় ইতিহাস, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব বিশ্লেষণের সমন্বয় দেখা যেত।

তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় বৈশিষ্ট্য ছিল দলের প্রতি আনুগত্য, আন্দোলনের প্রতি নিষ্ঠা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাষ্ট্রীয় প্রশ্নে পরামর্শ দেওয়ার সক্ষমতা। ফলে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতৃত্বের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।

প্রজন্মের জন্য একটি রাজনৈতিক পাঠ
তোফায়েল আহমেদের জীবন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ভাষা আন্দোলন-পরবর্তী জাতীয়তাবাদী জাগরণ, ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন এবং গণতন্ত্রের অভিযাত্রা—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

তোফায়েল আহমেদের মৃত্যু শুধু একটি রাজনৈতিক দলের ক্ষতি নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক জীবন্ত অধ্যায়ের অবসান। তাঁর জীবন সংগ্রাম, নেতৃত্ব, দেশপ্রেম এবং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

রাজনীতির উত্তাল মঞ্চে তিনি ছিলেন একাধারে ছাত্রনেতা, মুক্তিযোদ্ধা, সংগঠক, সংসদ নেতা ও জননেতা। তাঁর বিদায়ে বাংলাদেশের রাজনীতি হারাল অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাণ্ডার। যদিও আর দশজন রাজনীতিবিদের মতোই তাঁরও বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকান্ড নিয়ে সমালোচনা রয়েছে তথাপি তাঁকে বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নক্ষত্র হিসেবে চিত্রিত করাই যায়।  ইতিহাস স্মরণ রাখবে তাঁকে স্বাধীন বাংলাদেশের নির্মাণযাত্রার একজন গুরুত্বপূর্ণ সহযাত্রী হিসেবে।

শিশির পারিয়াল

প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল।

সম্পর্কিত খবর

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদাতবার্ষিকী আজ

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক রাষ্ট্রপতি, স্বাধীনতার ঘোষক, মহান মুক্তিযুদ্ধের ১নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার ও বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা শহিদ জিয়াউর রহমান বীর উত্তমের...

শিবগঞ্জে লিচু চুরির অভিযোগে এক শিশুকে গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেফতার ২ : প্রতিমন্ত্রীর নির্দেশে লিচু ও উপহার প্রদান

শিবগঞ্জ (বগুড়া): বগুড়ার শিবগঞ্জে বাগানের লিচু খাওয়ায় এক শিশুকে গাছের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করার অভিযোগ পাওয়া গেছে,শুধু তাই নয় লিচু বাগানের মালিক শিশুটির...

চামড়া নিয়ে কামড়া কামড়ি নেই

কোরবানি এলেই পশুর চামড়া ঘিরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা চামড়া সংগ্রহ করেন। এতে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বাড়তি...

আওলাদে রাসুল (দ) ছৈয়দ শাহদাত উদ্দীন মাইজভান্ডারীর মৃত্যূতে আস্তানায়ে জহির ভান্ডারের শোক

আওলাদে রাসুল (দ), আওলাদে গাউছুল আযম মাইজভান্ডারী সুলতানুল আরেফীন হযরত ছৈয়দ সামশুল হুদা (ক:) মাইজভান্ডারীর ৪র্থ পুত্র হযরত ছৈয়দ শাহদাত উদ্দীন মাইজভান্ডারী পর্দা নিয়েছেন...

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের শুভেচ্ছা জানালেন এমপি সাঈদ আল নোমান

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সকল গণমাধ্যমকর্মী, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন সংসদ সদস্য সাঈদ...

চামড়া নিয়ে কামড়া কামড়ি নেই ন্যায্য মূল্য না পেয়ে অসংখ্য চামড়া রাস্তায় পচলো,এবার চামড়ার কোন দাম পেলেন না মৌসুমী চামড়া ব্যবসায়ীরা

দেশের চামড়ার বড় যোগান আসে ঈদুল আজহা থেকে। কোরবানি এলেই পশুর চামড়া ঘিরে ব্যাপক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড শুরু হয়। মৌসুমি ব্যবসায়ী, মাদ্রাসা ও এতিমখানার সঙ্গে...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত