রবিবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া : পলিটিক্যাল আইকন

সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনৈতিক দলের প্রধান, এবং পরবর্তীতে দেশের প্রধানমন্ত্রী। তিনিই তো প্রকৃত "পলিটিক্যাল আইকন"।

শিশির পারিয়াল

গতকাল ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ ইংরেজি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম একটি শোকাবহ দিন হয়ে থাকবে। কারণ এই দিনেই প্রিয় বাংলাদেশ ও তার চাইতেও অধিক প্রিয় বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মায়া কাটিয়ে পরম করুণাময় সৃষ্টিকর্তার ডাকে সাড়া দিয়ে পরলোকের সর্ব্বোচ্চ সম্মানিত স্থানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছেন চির গণতন্ত্রের পূজারি, বাংলাদেশের অভিভাবক ও বাংলার জনগণের কন্ঠস্বর আপসহীন নেত্রী অভিধায় সমাদৃত গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া। শত কোটি সালাম জানাই বাংলার চির সংগ্রামী নারী জীবনের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়ার বিদেহী আত্মার প্রতি।

চট্টগ্রাম মেইল পরিবারের বাকি সদস্যরা আমাকে গতকাল বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পরপরই বলছিলেন আপসহীন নেত্রীর উপর আমাকে একটি কলাম লিখতে। এবং আমারও উচিত চট্টগ্রাম মেইল পরিবারের প্রধান নির্বাহী হিসেবে এই মহীয়সী নেত্রীর বিদায়ে তাঁর আত্মার প্রতি সম্মান জানিয়ে লেখা এবং এই বিকল্পহীন রাষ্ট্র নেতৃত্বের বিষয়ে লেখার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে অত্যন্ত ধন্য এবং গৌরবান্বিত মনে করছি। কিন্তু সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে গেলাম তখনি যখন আমি লিখতে বসলাম। আমার মনে হলো আমি এই মহান নেত্রীর বিষয়ে কতটুকুই বা জানি!!! আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কর্মময় বর্ণিল জীবন হচ্ছে সমুদ্রতুল্য। সেই সুবিশাল সমুদ্রের কোন দিকটি নিয়ে আমি লিখবো!!! এই বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে আমি নিজেই অথৈ সমুদ্রে পড়ে গেলাম। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলাম, বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কর্ম জীবন নিয়ে গতকাল থেকে প্রচুর প্রশংসনীয় কলাম প্রকাশ হলেও শুধুমাত্র বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে উনি দেশের জনগণের জীবনযাত্রার মানের গুণগত পরিবর্তনের জন্য যেসকল উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সেগুলোর উপর সেভাবে আলোকপাত করা হচ্ছে না। কিন্তু এটা প্রয়োজন। কারণ বর্তমান তরুণ প্রজন্ম শুধুমাত্র পলাতক স্বৈরশাসক আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনার তথাকথিত উন্নয়নের গণতন্ত্র সম্বন্ধেই জানে। প্রকৃত গণতন্ত্র সম্বন্ধে তারা তেমন ওয়াকিবহাল নয়। সর্বদলীয় গণতন্ত্র নিশ্চিত করেও একটি দেশের ব্যাপক উন্নয়ন করা যায় সেটারই জলজ্যান্ত উদাহরণ বেগম খালেদা জিয়া। অতএব আমি সিদ্ধান্ত নিলাম আমার লেখায় আমি আমাদের আপসহীন নেত্রী তাঁর প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদে যেসকল যুগান্তকারী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন সেগুলোর উপরই আলোকপাত করবো, যাতে করে বর্তমান প্রজন্ম তাদের ভবিষ্যতের যোগ্য নেতৃত্বকে খুঁজে নিতে পারে।
নিচে তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালীন উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ও রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোর একটি ধারাবাহিক ও সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো—

প্রথম দফা (১৯৯১–১৯৯৬): গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার
১. সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা (১৯৯১)
১৯৯০-এর গণআন্দোলনের পর সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী পাস করে রাষ্ট্রপতি শাসন বাতিল।
বাংলাদেশে পুনরায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা চালু হয়।
২. গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বৃদ্ধি
সংবাদপত্র ও বেসরকারি গণমাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ শিথিল।
স্বাধীন মতপ্রকাশের পরিবেশ সৃষ্টি।
৩. শিক্ষা খাতে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ
মাধ্যমিক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে শিক্ষা কার্যক্রম চালু।
উপবৃত্তি ও স্কুলে উপস্থিতি বাড়াতে বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ।
শিক্ষা বিস্তারে নতুন স্কুল-কলেজ এমপিওভুক্তকরণ।
৪. অবকাঠামো ও যোগাযোগ
গ্রামীণ সড়ক ও সেতু নির্মাণে জোর।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ।
৫. প্রশাসনিক সংস্কার
সরকারি চাকরিতে দক্ষতা ও পেশাদারিত্ব বাড়াতে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা।
উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম জোরদার।
৬. বেসরকারি খাতের উন্নয়ন
বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি যে শক্তিশালী বেসরকারি খাতের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে তার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ কার্যক্রম শুরু হয়।
বেসরকারি আর্থিক ও বিনিয়োগ খাতকে শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।

দ্বিতীয় দফা (২০০১–২০০৬): অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত অগ্রগতি
১. অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধি
জিডিপি প্রবৃদ্ধি গড়ে ৫–৬% ধরে রাখা এবং শেষদিকে তা ৭ শতাংশে পৌঁছেছিলো।
বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি।
রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে প্রবাসী কল্যাণ কার্যক্রম জোরদার।
২. বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি।
নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন ও গ্যাস সংযোগ সম্প্রসারণ।
গ্রামীণ বিদ্যুতায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি।
৩. যোগাযোগ ও অবকাঠামো
জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন ও প্রশস্তকরণ।
গুরুত্বপূর্ণ সেতু ও ফ্লাইওভার নির্মাণের পরিকল্পনা ও কাজ।
বন্দর ও রেলওয়ে উন্নয়নে প্রকল্প গ্রহণ।
৪. তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ
মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ।
ইন্টারনেট ব্যবহারে প্রাথমিক অবকাঠামো তৈরি।
আইসিটি খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত।
৫. সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন
বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা সম্প্রসারণ।
গ্রামীণ দারিদ্র্য হ্রাসে মাইক্রোক্রেডিট কার্যক্রম জোরদার।
৬. বৈদেশিক সম্পর্ক ও কূটনীতি
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি সেনা প্রেরণ বৃদ্ধি।
মুসলিম বিশ্ব ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার।
প্রবাসী বাংলাদেশিদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় উদ্যোগ।
৭. শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও গুণগত পরিবর্তন
ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার শিক্ষার চাহিদা পূরণের জন্য বেসরকারি খাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপনকে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়।
বিভিন্ন পাবলিক এক্সামে (মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও অন্যান) নকল বা গণটোকাটুকি সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা হয়।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে সেশনজট দূর করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়।
৮. আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন
ক্ষমতা গ্রহণের শুরুতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলেও পরবর্তীতে বিশেষায়িত বাহিনী RAB গঠন করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়ে খুব দ্রুতই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটানো হয়। এমনকি নিজ দলের নেতা কর্মীদেরও ছাড় দেওয়া হয়নি। এমন দৃষ্টান্ত বাংলাদেশে বিরল।

উপরোক্ত বিষয়গুলি বিশ্লেষণ করলেই এটা স্পষ্ট হয়ে যায়, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বকালে দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নে যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন যেগুলোর সুফল আমরা এখনো পাচ্ছি। কিন্তু তিনি এইসকল যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন বহুদলীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই। তিনি পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগের মতো কূটকৌশল প্রয়োগ করে প্রতিপক্ষকে নির্বাচনের ময়দান থেকে পৃথক করে রাখেননি, বরং তিনি জনগণের আকাঙ্খার প্রতি সম্মান দেখিয়ে তত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের একটি সর্বজনগ্রাহ্য পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন যেটা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ আওয়ামী সভানেত্রী শেখ হাসিনা বাতিল করে দিয়ে দেশে তথাকথিত উন্নয়নের গণতন্ত্র নামক একদলীয় শাসন ব্যবস্থা প্রনয়ন করেন যা প্রকারান্তরে স্বৈরশাসনেরই নামান্তর। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর রাজনৈতিক নেতৃত্বকালের সময়ে যেসকল যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন তাতে করে তাঁকে বাংলাদেশের “পলিটিক্যাল আইকন” মানাই যায়। উনার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা শুধুমাত্র বাংলাদেশের রাজনীতিকদের জন্য নয় বরং পৃথিবীর সকল দেশের রাজনৈতিক নেতাদের জন্যই অনুকরণীয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যত রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য তিনিই হবেন প্রকৃতই অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের দুই মহান রাজনৈতিক চরিত্র আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অবিসংবাদিত নেতা বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তক ও গণমানুষের নেতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরেই বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় স্থানটি আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ারই থাকবে। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অতুলনীয় কর্মধারা আমাদের মাঝে অব্যাহত রেখে বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাবান ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার জন্য আমাদের সকলের উচিত এখন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার যোগ্য উত্তরসূরী জনাব তারেক রহমানকে সমর্থন দিয়ে উনাকে (তারেক রহমান) উনার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সুযোগ করে দেওয়া। এবং নিশ্চিতভাবেই উনার (তারেক রহমান) পরিকল্পনাই হচ্ছে পলিটিক্যাল আইকন বেগম খালেদা জিয়ার প্রণয়ন করে যাওয়া এই দেশের মেহনতি জনগণের মুক্তির উপায়।

শিশির পারিয়াল
ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল
e-mail :- parialbd@msn.com

সম্পর্কিত খবর

মুম্বাই ফিরেই দুর্ঘটনার মুখে অক্ষয়, তারপর যা করলেন নায়ক

বিদেশ সফর শেষে সোমবার সন্ধ্যায় মুম্বাই ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমার ও তাঁর স্ত্রী টুইঙ্কেল খান্না। তবে বড় দুর্ঘটনা...

স্পেনে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা : নিহত ২১, আহত বহু

স্পেনের দক্ষিণাঞ্চলে কর্দোবা শহরের কাছে দুটি দ্রুতগামী ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৭০ জনের...

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর উপর পানি ও ডিম নিক্ষেপ

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ সংসদীয় আসনের এনসিপি প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর নির্বাচনী প্রচারের পথসভায় ময়লা পানি ও ডিম নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে।...

‘মানুষের ডাকে ও সময়ের দাবিতে’ নির্বাচনী মাঠে – সাঈদ আল নোমান

‘মানুষের ডাকে ও সময়ের দাবিতে’ তিনি নির্বাচনী মাঠে জানিয়ে সাঈদ আল নোমান বলেন, নিজের রাজনৈতিক পদ পদবি বা কোন জায়গায় পৌঁছার অভিলাষে আমি এখানে...

উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানী করা হবে : জামায়াতের আমির

দেশের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনপদ উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির...

আসন্ন নির্বাচন ভবিষ্যতের সকল নির্বাচনের জন্য মানদণ্ড হবে : প্রধান উপদেষ্টা

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভবিষ্যতের সব নির্বাচনের জন্য একটি মানদণ্ড স্থাপন করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয়...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত