চট্টগ্রামে জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি ‘মুছে ফেলা’কে কেন্দ্র করে নগরে মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এসময় এলাকায় উভয় পক্ষের নেতাকর্মীদের মধ্যে বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। রোববার রাত ১১টার দিকে টাইগারপাস চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) প্রবেশমুখে মুখোমুখি অবস্থানে ছিল তারা। অবশ্য পুলিশ এসে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেয়। এতে অপ্রীতিকর কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। গতকাল সকাল থেকে উত্তেজনা বিরাজ করছিল ওই এলাকায়। এর প্রেক্ষিতে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত প্রধান সড়ক ও আশপাশের এলাকায় সব ধরনের জনসমাবেশ, মিছিল ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেন চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। তবে সেই আদেশ উপেক্ষা করে দুপুরে আবারও এনসিপির নেতাকর্মীরা গ্রাফিতি অংকনের জন্য রং নিয়ে জড়ো হয় টাইগারপাস এলাকায়। তাদের অভিযোগ, মেয়রের নির্দেশে গ্রাফিতি মুছে ফেলা হয়েছে। সরে যেতে বলা হলে এসময় পুলিশের সঙ্গে কয়েক দফা বাগবিতণ্ডায় জড়ায় তারা।
জানা যায়, টাইগারপাস এলাকায় এলিভেটেড এক্সপ্রেওয়ের পিলারে সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য রং করা হয়। বিষয়টি নজরে আসলে এনসিপি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, জুলাই গ্রাফিতি মুছে দিয়ে মেয়র পিলারে রং করেছেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের নেতাকর্মীরা ফেসবুকে স্ট্যাটাস ও লাইভে একে অপরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন। এ ইস্যুতে রাতেই বিক্ষোভ মিছিল করে এনসিপি’র নেতা-কর্মীরা। এসময় রং করা পিলারে মেয়র শাহাদাত ও জুলাই নিয়ে বিভিন্ন গ্রাফিতি অঙ্কন করা হয়। মহানগর এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব ডা. এম আর রহমান মাবরুর বলেন, শহীদের স্মৃতিবাহী দেয়ালচিত্র মুছে ফেলে বাণিজ্যিক ব্যবহারের উদ্যোগ জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ও অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, জনগণের আবেগ ও ইতিহাসের চেয়ে কার স্বার্থকে এখানে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে?
এদিকে এনসিসিপি’র এক বিবৃতিতে জানা যায়, টাইগারপাস এলাকায় জুলাই আন্দোলনের স্মারক গ্রাফিতি অপসারণের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ ও তীব্র নিন্দা জানান জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিসিপি । সংগঠনটির দাবি, এসব গ্রাফিতি শুধু দেয়ালচিত্র নয়, বরং জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগ, গণমানুষের আকাঙ্ক্ষা ও প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক। এগুলো অপসারণ করে বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন স্থাপনের উদ্যোগ জনমনে ক্ষোভ ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। গ্রাফিতি মুছে ফেলার পর এনসিসিপি ও জুলাইয়ের সহযোদ্ধারা পুনরায় দেয়ালচিত্র আঁকার উদ্যোগ নিলে কিছু বিএনপি নেতা-কর্মী তাতে বাধা দেন। অথচ পুরো সময়জুড়ে কোথাও যানচলাচল বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি। দেয়াল থেকে গ্রাফিতি মুছে ফেলা গেলেও মানুষের হৃদয় থেকে জুলাইয়ের স্মৃতি মুছে ফেলা যাবে না। জনগণের আবেগ, শহীদদের স্মৃতি ও ঐতিহাসিক প্রতীককে রাজনৈতিক সংকীর্ণতার উপকরণে পরিণত না করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি।
অন্যদিকো গ্রাফিতি মুছে ফেলার বিষয়ে গতকাল নিজ কার্যালয়ে কথা বলেন চট্টগ্রাম সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনের সময় তরুণরা যে ত্যাগ স্বীকার করেছে, তা শুধু মুখে বললে হবে না, বরং অন্তর থেকে ধারণ করতে হবে। তিনি বলেন, আজ অনেকে গ্রাফিতি বা নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনা করলেও আহত জুলাই যোদ্ধা ও তাদের পরিবারের কষ্টের কথা খুব কম মানুষই ভাবছে। গত ৩ আগস্ট আমার নিজের বাড়িতে আগুন ও বোমা হামলা চালানো হয়েছিল। সেখানে গ্যাস চেম্বার তৈরি করে হামলার ঘটনাও ঘটে এবং বৃদ্ধা মাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। ড্রাইভারের সাহসিকতায় পুরো ভবন পুড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়। এছাড়া ৪ আগস্ট আহত জুলাই যোদ্ধাদের হাসপাতাল থেকে বের করে দেওয়া হলে তাদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। ৬ আগস্ট চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে গিয়ে আহতদের ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দিয়েছি। আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের দিয়ে নান্দনিক গ্রাফিতি অঙ্কন করা হবে। চসিক যদি টাকা দিতে না পারে, তাহলে আমার পকেটের টাকায় এটি বাস্তবায়ন করবে বলে জানান চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
