শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

পঞ্চাশ বছর পরও অমর নজরুল

আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যু বার্ষিকী

দ্রোহ, সাম্য, মানবতা ও প্রেমের কবি আজও কেন এত প্রাসঙ্গিক।

সম্পাদকের ডেস্ক

আজ ১২ ভাদ্র। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৬ সালের এই দিনে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে যা বর্তমান বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে—নিভে গিয়েছিল বাংলা সাহিত্য ও সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের জীবনপ্রদীপ। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে। মৃত্যুর পাঁচ দশক পরও তাঁর কবিতা, গান ও দর্শন অন্যায়-অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা, বৈষম্য ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

নজরুলের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু তাঁর সৃষ্টি যেন মৃত্যুঞ্জয়ী। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে পৃথিবীর সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে বহু পরিবর্তন এলেও মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা, সাম্য ও ন্যায়ের আকাঙ্ক্ষা বদলায়নি। আর সেখানেই আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন নজরুল।

বিদ্রোহ থেকে মানবমুক্তির ডাক
১৮৯৯ সালের ২৪ মে পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে জন্ম নেওয়া নজরুলের জীবন ছিল বৈচিত্র্য ও সংগ্রামে পরিপূর্ণ। দারিদ্র্য, শৈশবের অনিশ্চয়তা, লেটোর দলে কাজ, মক্তবে শিক্ষকতা, সৈনিকজীবন—জীবনের নানা অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যিক চেতনাকে গভীরভাবে নির্মাণ করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীতে যোগ দেন তিনি। যুদ্ধশেষে কলকাতায় ফিরে সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘বিদ্রোহী’। সেই কবিতার মধ্য দিয়েই বাংলা সাহিত্যে যেন এক নতুন কণ্ঠের বিস্ফোরণ ঘটে। তিনি হয়ে ওঠেন ‘বিদ্রোহী কবি’।

কিন্তু নজরুলের বিদ্রোহ কেবল রাজনৈতিক শাসকের বিরুদ্ধে ছিল না। তাঁর বিদ্রোহ ছিল অন্যায়, কুসংস্কার, ধর্মান্ধতা, সামাজিক বৈষম্য, নারী-পুরুষের অসমতা এবং মানুষের ওপর মানুষের শোষণের বিরুদ্ধে।

তাই তাঁর বিদ্রোহ শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠেছিল মানুষের মুক্তির বিদ্রোহ।

সাম্যের কবি
নজরুল এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে মানুষের পরিচয় ধর্ম, বর্ণ, জাত কিংবা অর্থসম্পদ দিয়ে নির্ধারিত হবে না; মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় হবে—সে মানুষ।

তাঁর **‘সাম্যবাদী’, ‘সর্বহারা’, ‘কুলি-মজুর’, ‘মানুষ’**সহ বহু কবিতা ও প্রবন্ধে নিপীড়িত মানুষের অধিকারের কথা উঠে এসেছে। সমাজের প্রান্তিক মানুষ, শ্রমিক, কৃষক ও বঞ্চিত মানুষের জীবন তাঁর লেখায় পেয়েছে মর্যাদা।

নজরুল লিখেছিলেন—

“গাহি সাম্যের গান—
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান।”

এই সাম্যের দর্শন আজও বাংলাদেশের সমাজে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। অর্থনৈতিক বৈষম্য, সামাজিক বিভাজন কিংবা পরিচয়ের রাজনীতি—যে নামেই বিভেদ তৈরি হোক না কেন, নজরুলের মানবতাবাদ তার বিপরীতে দাঁড়ানোর শক্তি জোগায়।

অসাম্প্রদায়িক চেতনার অনন্য প্রতীক
নজরুলের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি তাঁর অসাম্প্রদায়িক মানবতাবাদ। তিনি একই সঙ্গে ইসলামী গান, হামদ-নাত, গজল যেমন লিখেছেন, তেমনি শ্যামাসংগীত, ভক্তিগীতি ও হিন্দু পৌরাণিক বিষয় নিয়েও অসংখ্য গান ও কবিতা রচনা করেছেন।

তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের বিভাজনের অস্ত্র ছিল না; বরং মানুষের আত্মিক সৌন্দর্যের পথ।

এই কারণেই নজরুল কেবল মুসলমানের কবি নন, কেবল হিন্দুর কবিও নন—তিনি সমগ্র বাঙালির কবি, সমগ্র মানবতার কবি।

আজ যখন পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ধর্মীয় বিদ্বেষ, উগ্রতা ও পরিচয়ের সংঘাত নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তখন নজরুলের অসাম্প্রদায়িক দর্শন আরও বেশি প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।

নারীমুক্তির অগ্রদূত
নজরুল তাঁর সময়ের তুলনায় নারীর অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে ছিলেন অত্যন্ত প্রগতিশীল। ‘নারী’ কবিতায় তিনি নারীকে পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং মানবসভ্যতার সমান নির্মাতা হিসেবে দেখেছেন।

তিনি লিখেছিলেন—

“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”

প্রায় এক শতাব্দী আগে উচ্চারিত এই বক্তব্য আজও নারী-পুরুষের সমঅধিকারের আলোচনায় শক্তিশালী একটি বার্তা।

সংগীতের জগতেও বিপ্লব
নজরুল শুধু কবি নন; তিনি ছিলেন অসাধারণ গীতিকার, সুরকার ও সংগীতস্রষ্টা। তাঁর রচিত হাজার হাজার গান বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। প্রেম, প্রকৃতি, বিরহ, ভক্তি, দেশপ্রেম, বিদ্রোহ, সাম্য—জীবনের প্রায় প্রতিটি অনুভূতি তাঁর গানে জায়গা পেয়েছে।

বাংলা গজলকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁরল অবদান অসামান্য। একই সঙ্গে তিনি শ্যামাসংগীত, ইসলামী গান, দেশাত্মবোধক গান ও প্রেমের গান রচনা করে বাংলা সংগীতকে দিয়েছেন অভূতপূর্ব বৈচিত্র্য।

বাংলাদেশের রণসংগীত ‘চল্ চল্ চল্’ তাঁরই সৃষ্টি। ফলে বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সঙ্গেও নজরুল গভীরভাবে যুক্ত।

বাংলাদেশের সঙ্গে নজরুলের আত্মিক সম্পর্ক
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ মে অসুস্থ কবি ও তাঁর পরিবারকে কলকাতা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। এরপর বাংলাদেশ তাঁকে জাতীয় কবির মর্যাদা দেয়। জীবনের শেষ সময় তিনি কাটিয়েছেন এই দেশের মাটিতে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে তাঁর সমাধি যেন তাঁর নিজেরই একটি আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। তাঁর কবিতায় তিনি লিখেছিলেন—

“মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই।”

আজও তাঁর সমাধিতে ফুল নিয়ে আসেন অগণিত মানুষ। শ্রদ্ধা জানান শিল্পী, সাহিত্যিক, শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ।

পঞ্চাশ বছরেও কেন এত প্রাসঙ্গিক নজরুল?
নজরুলের মৃত্যুর অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পৃথিবী কি তাঁর কাঙ্ক্ষিত সমাজে পৌঁছাতে পেরেছে?

উত্তর সম্ভবত—না।

আজও পৃথিবীর কোথাও যুদ্ধ, কোথাও দারিদ্র্য; কোথাও বর্ণবাদ, কোথাও ধর্মীয় বিদ্বেষ; কোথাও নারী নির্যাতন, কোথাও শ্রমজীবী মানুষের অধিকারহীনতা। অর্থনৈতিক বৈষম্যও বহু সমাজে ক্রমশ প্রকট হচ্ছে।

তাই নজরুলের দ্রোহ আজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা, তাঁর সাম্য বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন, তাঁর মানবতা মানুষের মর্যাদার দর্শন এবং তাঁর প্রেম বিভক্ত পৃথিবীকে এক করার আহ্বান।

এ কারণেই পাঁচ দশক পরও নজরুল পুরোনো নন।

বরং সময় যত এগোচ্ছে, তাঁর সৃষ্টির নতুন নতুন অর্থ উন্মোচিত হচ্ছে।

নজরুলকে শুধু স্মরণ নয়, ধারণ করতে হবে
জাতীয় কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে তাঁকে স্মরণ করা হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, কবি নজরুল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান নানা কর্মসূচি নিয়েছে।

চলতি ‘নজরুল বর্ষে’ তাঁর সৃষ্টিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার সুযোগটিও গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ২০২৬ সালের ২৫ মে থেকে ২০২৭ সালের ২৫ মে পর্যন্ত সময়কে নজরুল বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছে।

তবে নজরুলকে সত্যিকার অর্থে সম্মান জানাতে হলে শুধু তাঁর জন্ম ও মৃত্যুদিনে ফুল দেওয়া যথেষ্ট নয়। তাঁর সাহিত্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে; নজরুল গবেষণাকে আরও বিস্তৃত করতে হবে; তাঁর সংগীতের শুদ্ধ চর্চা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, তাঁর সাম্য, মানবতা, অসাম্প্রদায়িকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করতে হবে।

কারণ নজরুলকে স্মরণ করার সবচেয়ে বড় উপায় তাঁর কবিতা আবৃত্তি নয়—নজরুলের আদর্শকে জীবনে ধারণ করা।

পঞ্চাশ বছর আগে তাঁর কণ্ঠ থেমে গেছে। কিন্তু তাঁর বিদ্রোহ থামেনি, তাঁর সাম্যের স্বপ্ন থামেনি, মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও থামেনি।

তাই আজও তিনি উচ্চারণ করেন—

“বল বীর—
বল উন্নত মম শির!”

আর সেই উচ্চারণই প্রমাণ করে—নজরুল মৃত্যুঞ্জয়ী।

সম্পর্কিত খবর

একনেকে ১২টি প্রকল্প অনুমোদিত : রাজধানীতে ৩টি নতুন মেট্রোরেল প্রকল্প

ছবি - সংগৃহীতআজ বুধবার ১৬ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একনেকের বৈঠকে রাজধানী ঢাকায় তিনটি মেট্রোরেলসহ মোট ১২টি প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ...

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিনের সাথে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সাক্ষাৎ

ছবি : সংগৃহীত   ভারতে পলাতক ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী ফ্যাসিবাদের দোসর ও আদালতে দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিরা যাতে দেশে ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করতে...

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় পুনরায় সার উৎপাদনে যাচ্ছে সিইউএফএল

চট্টগ্রাম : চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ইউরিয়া সারের প্রধানতম কাঁচামাল অ্যামোনিয়া গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ায় পুনরায় সার উৎপাদনে যাচ্ছে এবং মেকানিক্যাল ত্রুটি সারিয়ে...

স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ পাঠ্য পুস্তকে

শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের লেখা নিবন্ধ ‘স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতি’ আগামী শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে তার তৎকালীন ঐতিহাসিক একটি ডায়েরির ছবিও বইয়ে যুক্ত...

বিটিভি চট্টগ্রাম কেন্দ্র’র কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সংবাদে সয়লাব, তীরের মুখে ঈমাম হোসেন

চট্টগ্রামে অনিয়ম-দুর্নীতি এবং জালিয়াতির মাধ্যমে শিল্পীদের টাকা আত্মসাতসহ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের সাবেক গবেষণা সম্পাদক, আওয়ামী লীগ সরকার আমলের বিশেষ সুবিধাভোগী...

অপরাধ দমন ও মাদক উদ্ধারে বিশেষ অবদানে শ্রেষ্ঠ ওসি পুরস্কৃত হলেন ফরিদা ইয়াসমিন

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নির্বাচিত হয়েছেন মীরসরাই থানার ফরিদা ইয়াসমিন। এর আগেও তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মঙ্গলবার (...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত