চট্টগ্রামের নন্দকানন বুদ্ধ বিহারে প্রবারণা পূর্ণিমা উপলক্ষে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে হাজারো ফানুস উড়িয়েছেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভক্তরা। রাতের আকাশে একের পর এক ফানুস যখন মিটিমিটি আলো ছড়িয়ে দূর আকাশে মিলিয়ে যায়, তখন মনে হয় অন্ধকারের বুক চিরে মানুষ যেন উড়িয়ে দিচ্ছে শান্তি, মৈত্রী ও মানবতার একেকটি স্বপ্ন। আলো ঝলমলে এই দৃশ্য কেবল ধর্মীয় উৎসবের সৌন্দর্য নয়, এর গভীরে লুকিয়ে আছে আত্মশুদ্ধি, ত্যাগ, সংযম ও সত্যের পথে এগিয়ে চলার এক মহৎ শিক্ষা।
প্রবারণা পূর্ণিমা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম পবিত্র ধর্মীয় উৎসব। সাধারণত আশ্বিনী পূর্ণিমায় এই উৎসব পালিত হয়। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের তিন মাসব্যাপী বর্ষাবাসের সমাপ্তি ঘটে এই পূর্ণিমায়। ‘প্রবারণা’ শব্দের সঙ্গে আত্মসমালোচনা, ভুল স্বীকার এবং অন্যের কাছ থেকে নিজের ত্রুটি সংশোধনের সুযোগ গ্রহণের গভীর তাৎপর্য জড়িয়ে আছে। এ দিন বৌদ্ধ ভিক্ষুরা পারস্পরিকভাবে নিজেদের ভুলত্রুটি তুলে ধরার সুযোগ দেন। এর মধ্য দিয়ে সত্যকে গ্রহণ করা, অহংকার ত্যাগ করা এবং নিজেকে পরিশুদ্ধ করার শিক্ষা প্রতিফলিত হয়।

বৌদ্ধ ঐতিহ্যে প্রবারণা পূর্ণিমার সঙ্গে ফানুস ওড়ানোর রীতিও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তবে ফানুস ওড়ানোর প্রথা ঠিক কখন, কোথায় এবং কীভাবে প্রথম শুরু হয়েছিল, তার নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক তথ্য সর্বত্র এক নয়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন বৌদ্ধ সমাজে এই প্রথা ভিন্ন ভিন্ন লোকাচার ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে। অনেক স্থানে ফানুসকে বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন, পুণ্যকর্মের প্রতীক এবং অন্ধকার থেকে আলোর পথে উত্তরণের প্রত্যাশা হিসেবে দেখা হয়। প্রচলিত বিশ্বাসে ফানুসের ঊর্ধ্বগমন মানুষের মনের অশুভ চিন্তা, হিংসা ও বিদ্বেষ দূর করে শুভবোধ জাগানোর প্রতীকী বার্তা বহন করে।
নন্দকানন বুদ্ধ বিহারের আকাশে যখন শত শত ফানুস জ্বলে ওঠে, তখন সেই আলো যেন মানুষের অন্তরের অন্ধকারের দিকেও প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। আমরা কি সত্যিই অন্যের দুঃখ বুঝতে শিখেছি? হিংসা, বিদ্বেষ, লোভ ও অহংকারের ঊর্ধ্বে উঠতে পেরেছি? বুদ্ধের শিক্ষা তো কেবল বিহারের প্রার্থনায় সীমাবদ্ধ নয়; তার প্রকৃত প্রকাশ মানুষের আচরণে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোয়, অন্যের প্রতি সহনশীল হওয়ায়, প্রাণের প্রতি মমতা দেখানোয় এবং সকলের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করায়।

ফানুসের আলো তাই শুধু আকাশকে আলোকিত করে না, মানুষের বিবেককেও জাগিয়ে তোলার আহ্বান জানায়। বুদ্ধের অহিংসা, করুণা, মৈত্রী ও প্রজ্ঞার আদর্শ যদি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ধারণ করা যায়, তবে ধর্মীয় উৎসবের আনন্দ সার্থক হয়ে উঠবে। ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্য বিভেদে নয়, মিলনে; প্রতিযোগিতায় নয়, সহমর্মিতায়।
নন্দকাননের রাতের আকাশে ভেসে চলা আলোকিত ফানুসগুলো একসময় দৃষ্টিসীমার বাইরে হারিয়ে যায়। কিন্তু তাদের রেখে যাওয়া প্রতীকী বার্তা থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে নিজে আলোকিত হও, অন্যের পথেও আলো ছড়াও। প্রবারণা পূর্ণিমার এই উৎসব তাই শুধু ফানুস ওড়ানোর নয়; মানুষের অন্তরে মানবতার আলো জ্বালানোরও উৎসব।
