রবিবার, জানুয়ারি ২৫, ২০২৬

মব সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ : প্রেক্ষাপট ও করণীয়

নিজস্ব প্রতিবেদক

মব সন্ত্রাসের কবলে বাংলাদেশ : প্রেক্ষাপট ও করণীয়

 

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র জনাব ওসমান হাদির দূঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুকে কেন্দ্র করে পুরো দেশজুড়ে যে ভয়ংকর তান্ডবলীলা চালানো হলো সেটার পিছনে মূল উদ্দেশ্য কি? মূল উদ্দেশ্য যদি আপনি উদঘাটন করতে চান তাহলে প্রথমেই আমাদেরকে এই ধরনের ঘটনা বাংলাদেশে সংগঠিত হওয়ার ভিত্তি কখন এবং কোথা থেকে শুরু হয়েছিলো সেটা একটু বিশ্লেষণ করা জরুরি।

বর্তমানে পুরো বাংলাদেশজুড়ে যেসকল ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটে চলেছে সেগুলোকে মব সন্ত্রাস নামে অবহিত করা হচ্ছে। তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে এই মব মানে কি? যখন একদল উত্তেজিত জনতা একত্রিত হয়ে পূর্বপরিকল্পনা মোতাবেক বা কোনো রকম পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই কোনো কারণে বা কোনো বিষয়ে যথোপযুক্ত প্রমাণ ছাড়াই একজন বা একাধিক অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আইনের আওতায় হস্তান্তর না করে নিজেরাই অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিচার করার নামে আইন নিজেদের হাতে তুলে নেয় তখনি তাকে মব বলে অভিহিত করা যায়। হয়তো আমার দেওয়া সংজ্ঞাটির সাথে কারো ছেটোখাটো মতপার্থক্য হতে পারে কিন্তু মোটামুটিভাবে মব বলতে এই ধরনের আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাকেই বুঝিয়ে থাকে। এবার আসুন আমরা একটু পিছনে ফিরে তাকিয়ে দেখি বাংলাদেশে মব কবে থেকে শুরু হয়েছিলো।

অনেকেই হয়তো বলবেন মব সন্ত্রাস বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সৃষ্টি। আসলে বিষয়টি সঠিক নয়। ছোটোখাটো মব সন্ত্রাস বাংলাদেশে প্রায় সবসময়ই চালু ছিলো। ছেলেধরা সন্দেহে গণ পিটুনি বা ডাকাত/চোর সন্দেহে পিটিয়ে মেরে ফেলা এইধরনের সংবাদ তো আমরা প্রায়ই পত্রিকার পাতায় দেখতে পাই। এটাই তো মব। তবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে মবকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রচলন শুরু হয় বিগত পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ সবসময়ই অসাম্প্রদায়িক চেতনার কথা বলে আসলেও বিগত আওয়ামী সরকারের আমলেই ধর্মীয় অবমাননার অপ্রমাণিত অভিযোগ তুলে সেটাকে ভিত্তি করে দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর প্রায়ই একটি ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্টী হামলা করে জানমালের ক্ষতি করতো। এটাই তো মব, তাই না!!! এই সংবাদগুলো সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত বা প্রচারিত হলেও তৎকালীন আওয়ামী সরকার একটা মবের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিয়েছে এরকম কোনো প্রমাণ নেই। আওয়ামী আমলে ধর্ম অবমাননার অজুহাতে যে পরিমাণ মব সংগঠিত হয়েছে তার সবগুলোর বিবরণ এখানে দিতে গেলে পাঠকের ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটতে পারে। তাই আমি আওয়ামী আমলে সংগঠিত প্রধান তিনটি মব সন্ত্রাসের কথা উল্লেখ করছি।

১. ২০১২ সালে কক্সবাজারের রামুতে ২৯ ও ৩০ সেপ্টেম্বর বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের উপর একটি ফেসবুক পোষ্ট কে কেন্দ্র করে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনা ঘটেছিলো।

২. ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে আরেকটি ফেসবুক পোষ্ট কে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হামলা সংগঠিত হয়।

৩. ২০২১ সালে কুমিল্লার একটি দুর্গা পূজার মন্ডপে পবিত্র কুরআনের অবমাননার অভিযোগ তুলে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হামলা চালানো হয় যা পরবর্তীতে পুরো দেশে সাম্প্রদায়িক দাংগা আকারে ছড়িয়ে পড়ে। একাধিক ব্যক্তি নিহত হন এবং প্রচুর মন্দির ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। যদিও পরবর্তীতে পুলিশের তদন্তে পবিত্র কুরআন অবমাননার অভিযোগটি সঠিক নয় বলে প্রমাণিত হয়। উল্লেখ্য এই ঘটনার পিছনে মূল ইন্ধনদাতা হিসেবে স্থানীয় আওয়ামী সংসদ সদস্যের নাম উঠে আসে।

উপরোক্ত তিনটি সাম্প্রদায়িক মব হামলার ঘটনা পুরো দেশজুড়ে এমনকি আন্তর্জাতিকভাবেও ব্যাপক আলোড়ন সৃস্টি করলেও তৎকালীন আওয়ামী সরকার একটা মব সন্ত্রাসের ঘটনারও যথাযথ বিচার করেনি। উদ্দেশ্য ছিলো মৌলবাদী ধর্মীয় গোষ্টীকে খুশি করে নিজেদের চেয়ার ধরে রাখা।

অর্থাৎ আমরা বলতেই পারি মব সন্ত্রাস রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেতে শুরু করে মূলত বিগত আওয়ামী সরকারের আমল হতেই। তবে তা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ও পরিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ৫ই আগষ্টের পর মুজিবনগরে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মারক ভাষ্কর্য ভাংচুর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে হামলা, বংগবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষ্কর্য ভাংচুর করে তার উপর দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করা, জাতির সূর্য সন্তান বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অপদস্ত করা এবং গলায় জুতার মালা দেওয়া, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে আওয়ামী সংযোগের অজুহাতে বিভিন্ন শিক্ষকদের গণহারে অব্যাহতি দেওয়া, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সূতিকাগার এবং বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সম্পত্তি ৩২নং ধানমন্ডির উপর ভয়াবহ আক্রমণ করা, ফিলিস্তিন অধিকার রক্ষার নামে বাটা ও কেএফসির শোরুম ভাংচুর ও লুটপাট করা – এগুলো সবই হচ্ছে মব সন্ত্রাসের বিভিন্ন রুপ। প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার, সহকারী ভারতীয় হাই কমিশনের উপর এবং ছায়ানট ও উদীচীর উপর হামলা এগুলোর ধারাবাহিকতা মাত্র। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় পূর্বে ঘটা মবগুলোর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গ্রহণ করেনি এবং একারণেই বর্তমানে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। কখনো বিক্ষুব্ধ ছাত্র জনতার ব্যানারে আবার কখনো ইসলামি তৌহিদি জনতার ব্যানারে এই হামলাগুলোকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে এই হামলাকারীরা নাতো ছাত্র জনতা নাতো ইসলামি তৌহিদি জনতা ছিলো। কারণ আমাদের সাধারণ ছাত্র জনতা কখনোই ধ্বংসাত্নক ছিলো না, এখনো নেই। আর ইসলাম ধর্মেও উগ্রবাদীতার কোনো স্থান নেই। ইসলাম সবসময়ই শান্তি, সাম্যতা, সহাবস্থান ও ন্যায় বিচারের কথা বলে। তাহলে এই ধ্বংসাত্মক গোষ্টী কারা? এরা হচ্ছে সেই বাংলাদেশ সৃষ্টির বিরোধী  প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মান্ধ মৌলবাদী গোষ্টী যারা বাংলাদেশকে পাকিস্তানের ন্যায় একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করে ৫৪ বছর পূর্বে তাদের পূর্বপুরুষদের লজ্জাজনক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে চায় এবং যাদেরকে ব্যবহার করে বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকার বারবার নিজেদের চেয়ার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলো।

তাহলে এখন আমাদের করণীয় কি? প্রথমত সরকারকে অত্যন্ত কঠোর হস্তে যারাই এই ধ্বংসযজ্ঞের সাথে জড়িত তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় এনে দমন করতে হবে। তবে গতকালকে দেওয়া মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা ও তাঁর প্রেসসচিবের বিবৃতি পড়ে মনে হচ্ছে তাঁরা অত্যন্ত হতাশ এবং পরিস্থিতির উপর তাঁদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। আর বর্তমান সরকার যেহেতু রাজনৈতিক না সেহেতু তাঁরা এইধরনের জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় সম্পূর্ণভাবে সফল নাও হতে পারেন। কাজেই এখন দল মত নির্বিশেষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী দেশপ্রেমিক জনগণকে ঐক্যবদ্ধভাবে সতর্ক থাকতে হবে যেনো বর্তমান বেসামাল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে তৃতীয় কোনো পক্ষ ফায়দা হাসিল করতে না পারে। এবং সরকারের উচিত হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত করে জনগণের ম্যান্ডেট প্রাপ্ত দলকে দেশের শাসনভার বুঝিয়ে দিয়ে প্রস্থান করা। দেশবাসীর উচিত হবে যারা প্রকৃত বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে তাদেরকে ব্যাপকভাবে ভোট দিয়ে দেশের শাসনভার বুঝিয়ে দেওয়া। একমাত্র তবেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ চলমান ঘোর অমানিশা কাটিয়ে আবার মাথা উঁচু করে বিশ্ব-দরবারে দাঁড়িাতে পারবে। যেহেতু সংকটজনক মূহুর্তে বাংলাদেশের জনগণ অতীতেও কখনো ভুল করেনি, আশাকরি এবারও করবেনা। পরিশেষে অকালে আমাদেরকে ছেড়ে চলে যাওয়া জনাব ওসমান হাদির বিদেহী আত্মার প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা এবং এই পৈশাচিক ঘটনা ও সকল মব সন্ত্রাসের যথাযথ বিচার করার আহ্বান জানাই।

শিশির পারিয়াল

ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল

সম্পর্কিত খবর

চট্টগ্রামের জে এম সেন হল প্রাঙ্গণে ১৫টি প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে চলছে সরস্বতী দেবীর আরাধনা।

চট্টগ্রামে প্রতি বছরের মতো এবারও জে এম সেন হল প্রাঙ্গনে আয়োজিত হচ্ছে একাধিক প্রতিষ্ঠানের আয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন মন্ডপে সরস্বতী পুজা। এই আয়োজনে ১৫টি প্রতিষ্ঠান...

উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানী করা হবে : জামায়াতের আমির

দেশের অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া জনপদ উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে রূপান্তরের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যজোটের শীর্ষ নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির...

গণতন্ত্র ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয় : জনাব তারেক রহমান

আজ বৃহস্পতিবার ২২ জানুয়ারি সকালে সিলেট নগরের একটি অভিজাত হোটেলে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক...

বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ বাদ পড়ার মুখে

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট বিশ্বকাপের ঠিক আগে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ঘিরে তৈরি হয়েছে চরম নাটকীয় পরিস্থিতি। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (ICC) কড়া অবস্থান নিয়ে বাংলাদেশকে ২৪ ঘণ্টার সময়...

সাকিব আবার লাল সবুজের প্রতিনিধিত্ব করতে যাচ্ছেন

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে না পারার জন্য বাংলাদেশের যেসকল ক্রিকেট ভক্তরা মন খারাপ করে আছেন তাদের জন্য বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড বিসিবি দারুণ একটি সুখবর দিয়েছে।...

আগামী নির্বাচন বাংলাদেশকে টিকিয়ে রাখার নির্বাচন : মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান, সাবেক মেয়র ও মন্ত্রী মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেছেন, চট্টগ্রাম-৯ রাজধানীর মর্যাদাসম্পন্ন একটি আসন। এই আসনের ভোটারণদেরকেও আমরা রাজধানীর ভোটারদের ন্যায়...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত