শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

বাংলাদেশে তিন পার্বত্য অঞ্চলের ভোট একটু ভিন্ন

পাহাড়ে ভোটের রাজনীতির হালচাল

পাহাড়ের ভোট কার দিকে যাচ্ছে?

চট্টগ্রাম মেইল ডেক্স

পথে পথে ব্যানার-ফেস্টুন, প্রার্থী ও তাদের লোকজন ছুটছেন এলাকার এ প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে। নির্বাচনের এই যে আমেজ দেশের বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাচ্ছে, সেই তুলনায় একেবারেই মলিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নির্বাচনী পরিবেশ।

এর পেছনে দুইটি কারণের কথা জানা গেছে ভোটার, স্থানীয় সাংবাদিক ও নির্বাচনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে।

সবাই একবাক্যে বলেছেন–– নির্বাচন মানে ভোটের লড়াই নিয়ে উৎসবের আমেজ, তবে এই জেলায় শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তারা দেখেন না।

আর অন্য কারণটি হলো, এবারের নির্বাচনে পার্বত্য অঞ্চলের কোনো আঞ্চলিক সংগঠনের কেউ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন না। ফলে এই নির্বাচনটি পাহাড়ি ভোটারদের একটা বড় অংশের কাছে ‘পানসে’ নির্বাচন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় নানা ইস্যুকে কেন্দ্রে করে কিছুদিন পরপর অনেকটাই অশান্ত হয়ে উঠছে পার্বত্য অঞ্চল। সংঘাত-সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও বেড়েছে গত দেড় বছরে। যে কারণে ভোটারদের অনেকেই বলেছেন, এই নির্বাচনে যারাই জিতুক, তারা যেন অন্তত পাহাড়ে শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরাতে কাজ করেন।

ঠিক এই বিষয়টিই দেখা গেছে নির্বাচনী প্রচারণায়ও। প্রার্থীরা স্লোগানে স্লোগানে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, ভোটে জিতলে শান্তি ও সম্প্রীতি ফেরাবেন এই জেলায়।

রাঙামাটির একটি বাজারের চিত্র

ক্যাপশান, রাঙামাটিতে নির্বাচনি আমেজ দেখা যাচ্ছে প্রচার প্রচারণায়

দেশের সবচেয়ে বড় এই জেলায় ১০টি উপজেলা রয়েছে। এমন ২০টি ভোটকেন্দ্রে এবার নির্বাচনী সরঞ্জাম ও কর্মকর্তাদের পাঠানো হবে হেলিকপ্টারে করে।

রাঙামাটির অতিরিক্ত জেলা প্রশাসন মুহাম্মদ রুহুল আমিন  বলেন, “এই এলাকায় নির্বাচনী কাজ সমতল এলাকার মতো না। এখানে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসার, গোয়েন্দা সংস্থা, ইউপি চেয়ারম্যান, নির্বাচন অফিসসহ অন্যান্য দপ্তরের সাথে মিলে একটা টিম ওয়ার্কের মাধ্যমে করতে হয়”।

অন্যদিকে, এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকার কারণেও কোথাও কোথাও সুষ্ঠু ভোট আয়োজনে সংকটের আশঙ্কা করছেন ভোটারদের কেউ কেউ।

রাঙামাটিতে কাপ্তাই লেকের ওপর ঝুলন্ত সেতু
ছবির ক্যাপশান, রাঙামাটির ভোটাররা চান, পাহাড়ে শান্তি ফেরাতে কাজ করবেন নির্বাচিতরা

ভোটাররা চান পাহাড়ে শান্তি ফিরুক

রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান–– বাংলাদেশে এই তিনটি পাবর্ত্য জেলা। অন্যান্য জেলায় যেখানে জনসংখ্যা বিবেচনায় একাধিক সংসদীয় আসন আছে, তবে পাবর্ত্য এই জেলাগুলোর প্রতিটিতে আসন একটি করে।

এই তিন জেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভোটারের আসন রাঙামাটি।

পাহাড়- ঝর্ণা-হ্রদ বেষ্টিত অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই জেলাটি দেশের অন্যতম একটি পর্যটন স্থানও। সেই সাথে আছে বৈচিত্র্যময় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। সারা বছরই দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে পর্যটকরা ঘুরতে আসেন এই জনপদে।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ঠিক যতটা, তার বিপরীতে নানা বঞ্চনা আর বৈষম্যের অভিযোগও আছে এই পার্বত্য জেলায়। যে কারণে আগামী নির্বাচন ঘিরে ভোটাররাও তাদের প্রত্যাশার কথাগুলো তুলে ধরছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীদের কাছে।

পার্বত্য এ অঞ্চলের প্রকৃতি শান্ত আর সৌন্দর্যে ঘেরা। কিন্তু নানা সংঘাত সহিংসতায় নানা কারণে প্রায়ই অশান্ত হয়ে এই পাহাড়ি অঞ্চল।

রাঙামাটি কলেজ মোড় এলাকায় কথা হয় নাফিজ হোসেন নামের এক তরুণের সাথে। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, এই জেলায় ভোটারদের চাহিদা অনেক কম। তার মধ্যে বড় একটা চাহিদা জাতিগত সম্প্রীতি।

ব্যাখ্যা করে তিনি বলছিলেন, কিছুদিন পরপরই ছোটখাটো ইস্যুকে কেন্দ্র করে হঠাৎই সংঘাত- সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। বাড়িঘরে আগুন কিংবা হত্যাযজ্ঞের মতো ঘটনাও ঘটে।

শহর থেকে বাইরে অসাম বস্তি বাজার এলাকায় কথা হয় সুমিত মারমার সাথে। তিনি বলছিলেন এই সহিংসতার প্রভাব কীভাবে পড়ে এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের ওপর।

তার ভাষায়, অন্যতম পর্যটন এলাকায় হওয়ায় সারা বছরই পর্যটক আসেন এই এলাকায়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে যখন পাহাড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে তখন পর্যটক আসা বন্ধ হয়ে যায়। যারা বিভিন্ন ধরনের পর্যটনকেন্দ্রিক ব্যবসায় জড়িত তারা পড়েন সবচেয়ে বড় সংকটে।

শহরের কলেজ মোড় এলাকায় কথা হয় সত্তরোর্ধ মোহাম্মদ সিরাজুদ্দৌলার সাথে। তিনি বলছিলেন, দিন দিন বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষের পকেটে টাকা নেই। জিনিসপত্রের দাম বাড়ছে। কিন্ত সরকারের পক্ষ থেকে এসব নিয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ তিনি দেখছেন না।

রাঙামাটির বেশিরভাগ ভোটারই বলেন, জেলায় পাহাড়ি-বাঙালি সম্প্রতি ধরে রাখা গেলে অর্থনৈতিক সংকট ও বেকারত্বের সমস্যাও সহজে দূর করা যেত। যদিও শান্তির টেকসই বা সঠিক কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ ভোটারদের অনেকের।

নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা
ছবির ক্যাপশান, নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন প্রার্থীরা

নির্বাচনে ফ্যাক্টর আঞ্চলিক সংগঠন

পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে পাঁচ লাখ নয় হাজার ভোটারের মধ্যে প্রায় অর্ধেক ভোটার বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এবং ভোটারদের মাঝে বেশ প্রভার রয়েছে পাবর্ত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর।

বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি বা জেএসএস এর বিপুল পরিমাণ সমর্থন রয়েছে পাহাড়ি ভোটাদের মাঝখানে।

এই জেএসএসের প্রভাব পার্বত্য তিন জেলায় থাকলেও সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাঙামাটিতে।

২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি সারাদেশে ভোট বয়কট করায় ১৫৩ আসনেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রার্থীরা জিতেছিল। আর বাকি যে ১৪৭টি আসনে ভোট হয়েছিল তার মধ্যে একটি ছিল এই রাঙামাটি।

২০১৪ সালের ওই নির্বাচনে রাঙ্গামাটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদারকে হারিয়ে জেএসএসের সহসভাপতি ঊষাতন তালুকদার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে চমক দেখিয়েছিলেন।

তবে ২০১৮ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে ঊষাতন তালুকদার অংশ নিলেও ওই নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ছিল এবং সেই ভোটে মি. তালুকদার আর জয় পাননি। জয় পান আওয়ামী লীগ প্রার্থী।

পরবর্তীতে ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে প্রার্থী দেয়নি জেএসএস সমর্থকরা। যে কারণে এই জেলার ভোটার উপস্থিতি ছিল অনেক কম। এমনকি আটটি ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটারই ভোট দিতে যাননি।

স্থানীয় এক গণমাধ্যমকর্মী  বলেন, পাহাড়ি এই সংগঠনগুলোর নিজেদের মধ্যে ইউনিটি বেশ শক্ত। তারা যখন সিদ্ধান্ত নেয়, এক সাথেই নেয়। যে কারণে তারা যদি সবাই মিলে ভোট বয়কট করে তাহলে ভোটকেন্দ্রে কোনো ভোটারই যাবে না।

আবার অন্তর্বর্তীকালীন এই সরকারের সময় অন্য অনেক রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নিলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় জেএসএস।

যে কারণ নির্বাচন ঘিরে যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভাবা হচ্ছিল তা অনেকাংশেই মলিন বলে মনে করছেন ভোটাররা।

জামায়াত-খেলাফত মজলিস জোটের প্রার্থীও চালাচ্ছেন ভোটের প্রচারণা
ছবির ক্যাপশান, জামায়াত-খেলাফত মজলিস জোটের প্রার্থীও জোরেসোরে চালাচ্ছেন ভোটের প্রচারণা

সুবিধায় বিএনপি, জামায়াত জোটে অসন্তোষ

রাঙামাটিতে এবার বিএনপির হয়ে নির্বাচনের মাঠে লড়ছেন আইনজীবী দীপেন দেওয়ান। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে রয়েছেন তিনি। এলাকায়ও তার পরিচিতি রয়েছে বলে জানাচ্ছেন ভোটাররা।

স্থানীয় বেশ কয়েকজন ভোটার বলছিলেন, এবারের নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর কোনো প্রার্থী না থাকায় সুবিধা পেতে পারেন মি. দেওয়ান। পাহাড়ি ভোটারদের ভোট তার দিকেও চলে যেতে পারে- এমন সম্ভাবনা দেখছেন তারা।

মি. দেওয়ান  বলেন, “আমি সবার ভালোবাসা ও সমর্থন নিয়েই নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। ভোটারদেরও সাড়া পাচ্ছি”।

তিনি এটাও বলেন, এবারের নির্বাচনে জয় পেলে তিনি সবার আগে গুরুত্ব দেবেন সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি রক্ষার কাজে।

অন্যদিকে, গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে এই জেলায় প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মোখতার আহমেদ। তিনি জামায়াত থেকে মনোনয়নও সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জোটের নির্বাচনী সমঝোতায় এই আসনটি ছাড়তে হয়েছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী আবু বকর সিদ্দিককে।

ভোটাররা বলছেন, তাদের মাঝে এই প্রার্থীর পরিচিতি তুলনামূলক কম, অন্যদিকে তাকে নিয়ে আগে থেকে প্রচারণাও ছিল না তেমন।

“আমরা ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছি। জামায়াত ও এনসিপি আমাদের সাথে আছে। আমরা আশা করছি ভোটের মাঠে আমরা ভালো করবো”।

এই দুই জোটের বাইরেও জাতীয় পার্টি, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, ইসলামী আন্দোলন, গণঅধিকার পরিষদ এবং স্বতন্ত্র একজনও লড়ছেন নির্বাচনের মাঠে।

মুকিমুল আহসান

সম্পর্কিত খবর

বিশ্বনেতাদের একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান

ফাইল ছবি :- প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান   টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বনেতাদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা ও যৌথ দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন...

শহীদ ২ সেনাসদস্যের পরিবারের হাতে সহায়তার চেক হস্তান্তর করলেন প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান

ছবি : সংগৃহীত   প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে ট্যাংক ফায়ারিংয়ের সময় গোলা বিস্ফোরণের দুর্ঘটনায় নিহত দুই সেনাসদস্যের পরিবারের সদস্যরা।...

দল-মত, বর্ণ ও গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে উঠে সর্বস্তরের মানুষের জন্য নিরপেক্ষভাবে কাজ করার শপথ নিয়েছি : রাষ্ট্রপতি জনাব ফখরুল ইসলাম আলমগীর

ছবি : সংগৃহীত   গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতি জনাব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরানসহ (রহ.) অসংখ্য ওলি-আউলিয়ার স্মৃতিধন্য সিলেটে...

শুধু ভালো ফল ও ডিগ্রি অর্জনই শিক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না : ডিসি জাহিদ

চট্টগ্রাম : সমাজে মানবিকতা ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঠেকাতে ব্যক্তিস্বার্থের চর্চা থেকে বেরিয়ে বিবেকের চর্চায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা।...

ক্যামেরা এখন পানির দাম, এক প্যাকেট সিগারেটের দামে ক্যামেরা পাওয়া যায় : শিল্প সচিব

চট্টগ্রাম : সরকার জাহাজভাঙা শিল্পের উন্নয়ন চায়, একই সঙ্গে চায় মৃত্যুহার জিরো হোক। শিল্পায়নের সঙ্গে রিস্ক ফ্যাক্টর আছে, সে ব্যাপারে সচেতন হতে হবে। এখন...

অপরাধ দমন ও মাদক উদ্ধারে বিশেষ অবদানে শ্রেষ্ঠ ওসি পুরস্কৃত হলেন ফরিদা ইয়াসমিন

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম জেলার শ্রেষ্ঠ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নির্বাচিত হয়েছেন মীরসরাই থানার ফরিদা ইয়াসমিন। এর আগেও তিনি জেলার শ্রেষ্ঠ ওসি নির্বাচিত হয়েছিলেন। মঙ্গলবার (...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত