‘পাহাড়ি ঝর্ণা তুমি তো জানোনা, তোমার নাম লিখে দিব/ ঝরে ঝরে আমিও ঝরি আমিও ঝরে পড়ি/ তুমি শুধু কি ছন্দে নাচ গো?’ – এমনই এক পাহাড়ি ঝর্ণার ছন্দের নাচন দেখব বলে এ যাত্রা।
এই ঝর্ণা নাম দেখে কেউ ভাববেন না এখানে শুধু বান্দর মানে বানর মারা হয়। বানর মারার লোককথা মুখে মুখে ফেরে এখনো। কিন্তু সেটা কবেকার কথা তা কেউ জানে না।
তাহলে এই পাহাড়ি ঝর্ণার নাম কি? মানুষ যে নামে কাউকে ডাকে সেটাই তো তার নাম। স্থানীয়দের মুখে নাম শুনেই এই ঝর্ণা দেখার ইচ্ছা হয়। তাই ছুটিতে বাড়ির ভাই-বন্ধুদের জড়ো করে বান্দরমারা ঝর্ণা দেখতে রওনা হই।

বান্দরমারা ঝর্ণা যেন স্রষ্টার এক অপূর্ব সৃষ্টি। সীতাকুণ্ড পাহাড় শ্রেণির এক প্রান্তে সীতাকুণ্ড সুপ্তধারা জলপ্রপাত আর অন্যপ্রান্তে হাটহাজারী উপজেলার বান্দরমারা ঝর্ণা। নয়নাভিরাম ঝর্ণার সৌর্ন্দয্য আর ঝিরিপথের আঁকাবাঁকা পাথুরে পথ ট্রেকিংকারীদের জন্য এক স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়। কোথাও বিস্তৃতি এলাকা জুড়ে যেন পাথরের রাজপ্রসাদ। ভ্রমণকারীদের জন্য প্রকৃতি সুনিপুণ হাতে যেন তৈরি করেছে বিশ্রামের স্থান, যেখানে কিছু সময় বিশ্রাম নিলে ভুলে যেতে হয় দুর্গম পথের সব ক্লান্তি।
চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার কাটিরহাট বাজার থেকে পশ্চিমে চলে গেছে বাড়বকুণ্ড সড়ক। ওই সড়ক ধরে সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে বশির হাট পৌঁছাই। সেখানকার দোকানিদের কাছ থেকে জেনে নিই ঝর্ণার রাস্তা কোন পথে এগিয়েছে।

ইট বাঁধানো গ্রামীণ সড়ক ধরে অল্প একটু হাঁটলেই শুরু ঝিরি পথ। এবার এগিয়ে যাই সেই ঝিরি পথ ধরে। দুই পাশে সবুজ বন। সেই বনের মাঝ দিয়ে এগিয়ে যাই সঙ্গীদের নিয়ে। নির্জন পাহাড়ের গায়ে ফুটে আছে দাঁতরাঙা ফুল। যেন সবুজ জমিনের চাদরে বেগুনি নকশার বাহার।
ঝিরি পথ জুড়ে ছোট বড় নানা আকারের পাথর। পাথরের গা ছুয়ে বয়ে চলেছে জলের ধারা। কোথাও হাঁটু পানি আবার কোথাও কোমর সমান। ঝিরির জল ডিঙিয়ে পথ চলা। জন মানুষের দেখা নেই।
৩০-৪০ মিনিট হাঁটার পর দু’পাশে খাড়া উঁচু পাহাড়ের দেখা মিলল। পাহাড়ের গা পাথুরে। কোন কোন পাথর নেমে এসেছে ঝিরিতেও। বড় বড় সেই পাথর ডিঙিয়ে এগিয়ে যেতে হয় কষ্ট করে। পাথরের গায়ে শ্যাওলা জমেছে। অসাবধানতায় পা পিছলাতে পারে যে কোন সময়। দুই পাশ থেকে নেমে এসেছে বাহারি লতা। এসব লতা এত মোটা যে একজন মানুষ অনায়াসে দোল খেতে পারে। আছে নানা রকম গাছপালা। গাছের ছায়ায় মায়াময় এক আলো আধারির খেলা সৃষ্টি হয়েছে ঝিরি পথে।
এভাবে আরো ১৫-২০ মিনিট হাঁটার পর দেখা মিলল কাঙ্ক্ষিত বান্দরমারা ঝর্ণার। প্রায় ৫০ ফুট উঁচু থেকে আপন ছন্দে ঝরে পড়ছে ঝর্ণার জল। নিচে যেখানে পানি জমছে সেটি প্রায় ৩০ ফুট চওড়া। গভীরতা ৪-৫ ফুট। ঝর্ণার দেখা পেয়ে সঙ্গীরা সব আনন্দে মেতে উঠলো। কেউ ঝর্ণার নিচে দাঁড়িয়ে ভিজছিল। কেউ বা আবার ডুব দিয়ে স্নানে ব্যস্ত হয়ে গেল।
নগর জীবনের ক্লান্তি ভুলতে মানুষ খোঁজে প্রকৃতির আশ্রয়। আর তা যদি হয় নির্মল জলধারা তাহলে প্রশান্তি যেন কয়েকগুণ বাড়ে। প্রকৃতির সন্তান মানুষ প্রকৃতির কোলে যেন নিজেকে ফিরে পায় অকৃত্রিম রূপে। এ আনন্দে নেই কোন মলিনতা। পানির ধারার সাথে ধুয়ে যায় সব অবসাদ।
বান্দরমারা ঝর্ণা নাম হলেও আমাদের যাত্রাপথে কোন বানরের দেখা পাইনি। তবে ঝর্ণার উপরের দিকে পাহাড়ি পথে হরিণের পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছিলাম। দূরের পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, মাঝে মাঝে সেখানে পানি খেতে আসে হরিণ আর নানা রকম পশুপাখি। বানর নিয়ে একটা গল্পও শুনতে পাই তাদের কাছে। বহু বছর আগে নাকি সেখানে অনেক বানর ছিল। আর ছিল শতবর্ষী বড় বড় অনেক গাছ। শতবর্ষী গাছ কাটার কারণে খাদ্যসংকটে পরে মারা যায় অনেক বানর। সেই থেকে নাম হয় বান্দরমারা।
হারিয়ে যাওয়া বানর আর ফেরেনি এই পাহাড়ি বনে। কিন্তু নাম রয়ে গেছে বান্দরমারা। যেমন আমাদের এই একদিনের যাত্রা শেষ হয়েছিল শেষ বিকেলে। কিন্তু এর স্মৃতি রয়ে যাবে সারা জীবন।
কেউ যদি এই বন-পাহাড়ের ঝর্ণায় যেতে চান তাহলে উপরের বর্ণিত পথে যেতে পারেন অনায়াসে। তবে ভরা বর্ষায় ঝর্ণায় না যাওয়াই ভালো। কারণ তখন বাড়তে থাকে পানির স্রোত। ঝিরি পথে পাথরের গায়ে জমে থাকা শ্যাওলাও হতে পারে বিপদের কারণ। তাই যাত্রাপথে সতর্কতা জরুরী। আর দিনের আলো থাকতে থাকতেই শেষ করতে হবে এই রোমাঞ্চকর অভিযান।
