মঙ্গলবার, এপ্রিল ২১, ২০২৬

বিএনপি সরকারের দুই মাস : ভবিষ্যতের জন্য করণীয়

শিশির পারিয়াল

চলতি বছরের বিগত ফেব্রুয়ারী মাসের ১৭ তারিখে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন জনাব তারেক রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রীর পদে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। আজকে ১৭ এপ্রিল তাঁর প্রধানমন্ত্রীত্বের মেয়াদের ২ মাস পূর্ণ হলো। যদিও মাত্র ২ মাসে একটি নতুন সরকারের মূল্যায়ন করাটা যুক্তিযুক্ত নয়, তথাপি এই ২ মাসে সরকার তার উপর অর্পিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করতে পারলো তা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা চলবেই। তাই চিন্তা করলাম চট্টগ্রাম মেইলের পক্ষ হতেও প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হয়ে জনাব তারেক রহমান প্রথম ২ মাসে কতটুকু কি করতে পারলেন তার একটা নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এই ২ মাসে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, পুরো বিশ্বে জ্বালানির দাম আশংকাজনক হারে বৃদ্ধি পেলেও বাংলাদেশে দাম বৃদ্ধি না করা ও খাল খনন সহ আরো অনেক ভালো উদ্যোগ জনাব তারেক রহমান গ্রহণ করেছেন। তবে এই কলামে প্রথম ২ মাসে জনাব তারেক রহমানের সফলতা নিয়ে আলোচনা করবো না, কারণ তিনি সফল হবেন এটাই পুরো দেশ ও জাতির প্রত্যাশা। বরং এখানে এমন ১০ টি বিষয় উল্লেখ করা হবে যেগুলোর উপর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে সতর্ক নজর রাখতে হবে এবং বিষয়গুলোর সমাধান যতো দ্রুত সম্ভব করতে হবে। আমার নির্ণয়কৃত ১০ টি খাতের সাথে দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতির সরাসরি কোনো সংযোগ নেই, কিন্তু এই ১০ টি খাতই হচ্ছে সরাসরি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট। এই বিষয়গুলোর উন্নয়ন না করতে পারলে আগামী ৫ বছর পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপিকে চড়া মূল্য চুকাতে হতে পারে।

১. বিশৃঙ্খল স্বাস্থ্য খাত : নবজাতক শিশু ও বাচ্চাদের টিকা কেলেঙ্কারির পর পুরো দেশের স্বাস্থ্য খাত চরম বিশৃঙ্খলায় পড়েছে। যদিও এটার জন্য দায়ী বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের চরম অজ্ঞতা ও অবহেলা। তথাপি বর্তমান সরকার যদি বিষয়টি দ্রুত সমাধান করে স্বাস্থ্য খাতে পুনরায় শৃঙ্খলা আনয়ন করতে না পারে তবে তা বিএনপির ভাবমূর্তি বহুলাংশে হ্রাস করবে।

২. অব্যাহত মব সন্ত্রাস : যদিও মব সন্ত্রাসের সংখ্যা এখন কমে এসেছে, তথাপি মব সন্ত্রাস সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে না পারলে তা বর্তমান সরকারের জন্য চরম বিড়ম্বনার সৃষ্টি করতে পারে। ২১ ফেব্রুয়ারী রুমিন ফারহানাকে শহীদ মিনারে ফুল দিতে না দেওয়া, মাজারে হামলা করে কথিত পীরকে পিটিয়ে হত্যা করা – এই ঘটনাগুলোই আমাদের সমাজে মব সন্ত্রাসের শক্তিশালী অবস্থানের জানান দেয়। মব সন্ত্রাস বন্ধ করতে না পারলে তা বর্তমান সরকারের জন্য একটি বড় মাপের অসফলতা হিসেবেই গণ্য হবে।

৩. দূর্ঘটনা প্রবণ পরিবহন খাত : বিগত ঈদ উল ফিতরের বন্ধের সময়ে বাংলাদেশ সড়কখাত ভয়াবহরকম দূর্ঘটনা কবলিত হয়ে উঠেছিলো এবং বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটায়। আর মাসখানেক পরেই পবিত্র ঈদ উল আযহা উদযাপিত হবে। ওই সময়ে কিভাবে দেশের সড়ক খাতে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় তার জন্য উপযুক্ত পরিকল্পনা এখনই প্রণয়ন করা উচিত। সর্বোপরি সমগ্র পরিবহন খাতকে দূর্ঘটনা মুক্ত করার জন্য সরকারের উচিত সমন্বিতভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা।

৪. জ্বালানি সংকট : পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের কারণে পুরো বিশ্বেই জ্বালানি সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সরকারের উচিত শক্তিশালী বিকল্প জ্বালানির উৎস খুঁজে বের করা এবং জ্বালানির ব্যবহার কমানোর উপায় খুঁজে বের করার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করা। সরকারের উচিত অন্তত ৩/৪ মাসের জ্বালানি মজুদের ব্যবস্থা করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

৫. ক্রমবর্ধমান বিদ্যুৎ সংকট : গরম যতোই বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততোই পুরো দেশ জুড়ে লোডশেডিংও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদিও বর্তমান বিদ্যুৎ সংকটের জন্য মূলত দায়ী হচ্ছে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কিছু অবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত, তথাপি পরিস্থিতির উন্নতি না হলে তা বর্তমান সরকারের অসফলতা হিসেবেই গণ্য হবে। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উচিত অচল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো কিভাবে সচল করা যায় সেটার উদ্যোগ গ্রহণ করা এবং প্রয়োজনবোধে নতুন বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি করা।

৬. মশার উপদ্রব বৃদ্ধি : পুরো দেশ জুড়েই আশংকাজনক হারে মশক কূলের অত্যাচার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর পেছনেও দায়ি মূলত বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অবহেলা। কিন্তু জনগণ তো সেটা মানবে না। অবিলম্বে মশক নিয়ন্ত্রণের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরী।

৭. শিক্ষা ক্ষেত্রে অতি সক্রিয়তা : মাননীয় শিক্ষা মন্ত্রী নিঃসন্দেহে একজন দক্ষ প্রশাসক। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণ করা মাত্রই তাঁর গৃহীত কিছু সিদ্ধান্ত ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। যেমন, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সময়সূচি এগিয়ে আনা, অনলাইন ক্লাশ আবার চালু করা, ঢালাওভাবে স্কুল সমূহে ভর্তি পরীক্ষা আবার চালু করা, পরীক্ষায় নকল প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষামূলক পদ্ধতির প্রবর্তন এবং ছাত্র ও শিক্ষকদের উদ্দেশ্যে কড়া নির্দেশনা প্রদান ইত্যাদি। মনে রাখা দরকার যেকোনো চালু পদ্ধতি হঠাৎই পরিবর্তন করতে গেলে তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া হতে পারে। অতএব দায়িত্ব নেওয়া মাত্রই চলমান শিক্ষা পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন করতে চাওয়াটা বুমেরাং হয়ে উঠতে পারে। এই বিষয়েও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নজরদারি একান্তই অপরিহার্য।

৮. বেপরোয়া চাঁদাবাজি : মাত্র ২ মাসেই ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অনেকগুলো অভিযোগ উঠেছে। এই বিষয়ে দলের শীর্ষ নেতৃত্বের জিরো টলারেন্স প্রয়োজন। অবশ্য এই বিষয়ে কিছুটা অগ্রগতি ইতিমধ্যেই লক্ষ্য করা গেছে।

৯. সংকুচিত রপ্তানি বাজার : বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানি খাত ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। নতুন রপ্তানি বাজার তো সৃস্টি করা হয়ইনি, বরং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠিত রপ্তানি বাজারগুলোতেই সুযোগ সংকুচিত হয়ে গেছে। এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য নতুন রপ্তানি বাজার খুঁজে বের করা এবং পুরানো বাজারগুলোর সাথে যোগাযোগ বৃদ্ধি করার জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর একটি উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সংসদীয় কমিটি গঠন করা উচিত। যে কমিটির সদস্যরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গিয়ে বাংলাদেশি পণ্যের জন্য নতুন বাজার অন্বেষণ করবেন। এই পদ্ধতি প্রয়োগ করে পাশ্ববর্তী দেশ ভারত ব্যাপক সফলতা পেয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত।

১০. রোহিঙ্গা সমস্যা : ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মানবিক সিদ্ধান্ত আজকে পুরো দেশ ও জাতির জন্যই মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যতোই দিন যাচ্ছে ততোই রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যাচ্ছে। এই বিষয়ে বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তো জাতির সাথে একপ্রকার প্রতারণাই করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে এই বিষয়টি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে মোকাবিলা করতে হবে। কারণ জাতিসংঘ ও পশ্চিমারা চাচ্ছে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশেই থেকে যাক। কারণ এর মাধ্যমে বাংলাদেশের জনবিন্যাসে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটানো সম্ভব হবে, যা কিনা একটি বিশেষ পক্ষকে ভোট ভিত্তিক রাজনীতিতে অন্যায্য সুবিধা দিতে পারে। বিএনপি সরকারের উচিত চীন ও ভারতের সাথে সম্মিলিতভাবে মায়ানমারের জান্তা সরকারের সাথে বৈঠক করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত যাওয়ার একটা রাস্তা খুঁজে বের করা। নতুবা অদূর ভবিষ্যতে এই রোহিঙ্গারাই বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবেনা।

শিশির পারিয়াল

প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল

সম্পর্কিত খবর

টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় জনাব তারেক রহমান

বিশ্বখ্যাত টাইম ম্যাগাজিনের ২০২৬ সালের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় স্থান পেয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব...

পুঁজিবাদের পেছনে ছুটতে ছুটতে আমরা ইতিহাস ঐতিহ্য ভুলতে বসেছি : বোধন আয়োজিত চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ উৎসবে বক্তারা

বাংলার ইতিহাসে গৌরবগাথা কম নয়। কিন্তু প্রায় স্মৃতির অতলে চলে গেছে আমাদের জাতীয় জীবনের এক অমূল্য বীরত্বগাথা চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহ। সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের সমস্ত অহংকার...

জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়ন করা হবে : জনাব তারেক রহমান

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব তারেক রহমান বলেছেন, জনগণ ম্যান্ডেট দিয়ে বিএনপিকে ক্ষমতায় এনেছে। সেই ম্যান্ডেট...

জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন পেলেন যারা

শত শত আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর অবশেষে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেছে সরকারি দল বিএনপি। আজ সোমবার ২০ এপ্রিল  বিএনপি'র...

রাশিয়া থেকে বাংলাদেশকে জ্বালানি তেল আমদানি করার অনুমতি দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন

রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করতে বাংলাদেশকে ৬০ দিনের জন্য নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় দিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন।পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, গত ১১...

চট্টগ্রামে জব্বারের বলি খেলা ও বৈশাখি মেলা উপলক্ষে নিরাপত্তা সমন্বয় সভা সিএমপি’র

আসন্ন ঐতিহ্যবাহী মরহুম আবদুল জব্বার স্মৃতি কুস্তি প্রতিযোগিতা (বলি খেলা) ও বৈশাখি মেলা উপলক্ষে সার্বিক আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নিরাপত্তা সমন্বয় সভা...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত