বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী ইতিহাসে যেসব রাষ্ট্রনায়ক দেশের পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এবং সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একজন মুক্তিযোদ্ধা, সেনা কর্মকর্তা এবং পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি এমন এক সময়ে দেশের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন, যখন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছিল।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে নীতি ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন, তা বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষকরা মনে করেন।
কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে অগ্রাধিকার
জিয়াউর রহমান বিশ্বাস করতেন যে বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি হচ্ছে কৃষি। তাঁর শাসনামলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে উন্নত বীজ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, সার সরবরাহ বৃদ্ধি এবং কৃষি ঋণের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। কৃষকদের উৎপাদনে উৎসাহিত করতে বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। এর ফলে খাদ্যশস্য উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় এবং খাদ্য ঘাটতি মোকাবিলায় দেশ কিছুটা স্বস্তি লাভ করে।
গ্রামমুখী উন্নয়ন কর্মসূচি
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল গ্রামীণ উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসা। তিনি “গ্রাম সরকার” ধারণা প্রচলনের মাধ্যমে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তাঁর উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাল খনন, রাস্তা নির্মাণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং জনসম্পৃক্ত উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়িত হয়। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
বেসরকারি খাতের বিকাশে ভূমিকা
স্বাধীনতার পর জাতীয়করণকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তে জিয়াউর রহমান বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করার নীতি গ্রহণ করেন। তিনি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন এবং শিল্পোন্নয়নের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেন। এই নীতির ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ উন্নত হয় এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বেসরকারি শিল্পখাতের বিকাশের ভিত্তি শক্তিশালী হয়।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও সামাজিক সচেতনতা
দেশের উন্নয়নের অন্যতম বাধা হিসেবে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে বিবেচনা করে তাঁর সরকার পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচিকে গুরুত্ব দেয়। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম জোরদার করার মাধ্যমে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করা হয়।
বৈদেশিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা
জিয়াউর রহমান বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করেন। তিনি মুসলিম বিশ্ব, পশ্চিমা দেশ এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে উদ্যোগী হন। এর ফলে বৈদেশিক সাহায্য, বিনিয়োগ এবং উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধির সুযোগ সৃষ্টি হয়।
তাঁর কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় হয় এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিদেশি সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়ন
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যুবসমাজকে জাতীয় উন্নয়নের শক্তি হিসেবে বিবেচনা করতেন। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বনির্ভরতা অর্জন এবং উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুবকদের সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়।
তাঁর সময়েই আত্মকর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরির ধারণা অধিক গুরুত্ব পেতে শুরু করে, যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
জাতীয়তাবাদ ও আত্মনির্ভরতার দর্শন
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ এবং আত্মনির্ভরশীল অর্থনীতি গঠন। তিনি জনগণকে উৎপাদন বৃদ্ধি, কঠোর পরিশ্রম এবং জাতীয় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।তাঁর এই দর্শন দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনা ও রাষ্ট্র পরিচালনায় দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেছে।
দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রচলন
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাত ধরেই দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয় এবং দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক কাঠামো সুশৃঙ্খল অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। তাঁর নিজের হাতে গড়া দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি পরবর্তীতে তাঁর দুর্ভাগ্যজনক শাহাদাত বরণের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে সামরিক স্বৈরশাসক এরশাদের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলে দেশে প্রকৃত সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রচলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এক গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তাঁর শাসনামলে গৃহীত কৃষি উন্নয়ন, গ্রামীণ অবকাঠামো নির্মাণ, বেসরকারি খাতের প্রসার, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বৈদেশিক সম্পর্ক জোরদারের মতো উদ্যোগগুলো দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে। যদিও তাঁর রাজনৈতিক জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে বিভিন্ন মত ও বিতর্ক রয়েছে, তবুও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও উন্নয়নের ভিত্তি সুদৃঢ় করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
শিশির পারিয়াল
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল।
