প্রস্তাবিত আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে মাননীয় অর্থমন্ত্রী জনাব আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, এবারের বাজেট একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক বা ইনক্লুসিভ বাজেট। তিনি বলেন, দেশের সব শ্রেণির মানুষকে বাজেট পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই বাজেট প্রণয়নে যে পরিমাণ শ্রম দিতে হয়েছে, তা আমরা দিয়েছি। কতটা সফল হয়েছি, তা দেশের মানুষ মূল্যায়ন করবে।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। এই সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ও আকাঙ্ক্ষা অনেক বেশি। তবে অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, আমরা দেশের প্রতিটি মানুষকে বাজেট চিন্তায় আনার চেষ্টা করেছি। কেউই এই বাজেটের আওতার বাইরে নেই বলে আমি মনে করি না। তিনি আরও বলেন, অর্থনীতিকে গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং যারা অর্থনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে ছিলেন, তাদেরও বাজেটের আওতায় আনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি জানান, এবারের বাজেটে একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ দেওয়া হয়েছে, যার ভিত্তিতে অর্থনীতিকে এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তিনি বলেন, এই পরিকল্পনার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা ভিন্ন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের মূল কৌশল দেশে ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমিয়ে আনা বলে উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তাদের মাঠে নামিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর নীতি ও সুশাসনের মাধ্যমেই বাজার স্থিতিশীল রাখা যায়। নীতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন না।
তিনি বলেন, বিগত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ অব্যাহত রয়েছে। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বেড়েছে, যার প্রতিফলন দেশের বাজারেও পড়ছে। পাশাপাশি অতীতে লুটপাট ও অর্থপাচারের কারণে ব্যাংক খাতে বড় ধরনের মূলধন ঘাটতি তৈরি হওয়ায় তহবিলের ব্যয় বেড়েছে, যা মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দিচ্ছে। তবে বহির্বিশ্বের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতির ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। কিন্তু অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবসার ব্যয় কমানো গেলে মূল্যস্ফীতির ওপর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এ জন্য সরকার বিভিন্ন সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে।
তিনি বলেন, দেশে একটি ব্যবসা শুরু করতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়। এতে সময় ও অর্থ—দুইয়েরই অপচয় হয়। এছাড়া উচ্চ সুদহার, বন্দর ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা, পণ্য খালাস থেকে কারখানা বা গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত অতিরিক্ত ব্যয় এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রশাসনিক অদক্ষতা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশের ব্যবসা সহজীকরণ সূচকের অবস্থান নিচের দিকে। এর অর্থ ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও তুলনামূলক বেশি। তাই বাজেটে বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব হবে।
সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বৃদ্ধির ওপরও গুরুত্বারোপ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলের মূল্য পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে তাৎক্ষণিক কেনাকাটার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রহ পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী অন্তত তিন মাসের জ্বালানি, খাদ্য ও সার মজুত রাখার সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে। এজন্য পর্যাপ্ত গুদাম ও বাফার স্টক ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। অতীতে গ্যাস আমদানিতে স্পট মার্কেটের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে ব্যয় বেড়েছে। এ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে সরকার গ্যাস, তেল ও খাদ্য সংগ্রহে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করছে। একই সঙ্গে বন্দর ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা নিশ্চিত এবং দুর্নীতি কমানো গেলে আমদানি ব্যয়ও কমে আসবে।
বাজার নিয়ন্ত্রণ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, পুলিশ বা সরকারি কর্মকর্তাদের মাঠে নামিয়ে মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কার্যকর নীতি ও সুশাসনের মাধ্যমেই বাজার স্থিতিশীল রাখা যায়। নীতিগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা খুব কঠিন হবে বলে তিনি মনে করেন না।
সবশেষে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জবাবদিহি নিশ্চিত করা, এবং সরকার সেই নীতিতেই অগ্রসর হচ্ছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, শিক্ষা মন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, অর্থ প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন, মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি, অর্থসচিব ড. মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদার, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান প্রমুখ।
