চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান এলাকায় শিশু বর্ষাকে ধর্ষণের পর খুনের ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলাটি ঘটনার সাড়ে ৩ বছরের বেশি সময় পেড়িয়ে গেলেও অবশেষে বিচার কার্য শুরু হয়েছে। ২১ জুলাই মামলাটির শুনানির ধার্য্য তারিখে চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল–১ এর বিচারক মোস্তাক আহমদ চার্জ গঠনের মাধ্যমে একমাত্র আসামি মুদি দোকানের কর্মচারী লক্ষণ দাশের বিরুদ্ধে বিচার কার্য শুরুর করার আদেশ দিয়েছেন এবং আগামী ২৮ জুলাই থেকে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রমের তারিখ ধার্য্য করেছেন। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাদীপক্ষের আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান।
তিনি জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯(২) ও দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় লক্ষণ দাশের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছেন বিচারক। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নৃশংস খুনের ১৯ দিনের মাথায় এবং চট্টগ্রামের বাকলিয়ার আলোচিত ৪ বছর বয়সি এক শিশুকে ধর্ষণের ২৬ দিনের মাথায় বিচার কার্যক্রম শেষ করা গেলেও প্রথম শ্রেণি পড়ুয়া বর্ষার বিচার শুরু হতে লেগে গেছে সাড়ে ৩ বছরের বেশি সময়। ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ও ডিএনএ রিপোর্ট দাখিলে বিলম্বের কারণে চার্জশিট দাখিলও হয় বিলম্বে। এরই ধারাবাহিকতায় বিচারও বিলম্বে শুরু হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শেষে মামলাটি শীঘ্রই রায়ের জন্য প্রস্তুত হবে।
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৪ অক্টোবর বিকালে নগরীর জামালখানের শিকদার হোটেলের পাশের গলির ভেতরে একটি মুদি দোকানের গুদামে পেঁয়াজের বস্তার উপরে পড়েছিল সাত বছর বয়সি শিশু বর্ষার মৃতদেহ। সেদিন অভিযুক্ত লক্ষণ দাশ শুধু যৌন কামনা চরিতার্থ করেনি, কান্নারত শিশু বর্ষার নাক মুখ, হাত চেপে ধরে মৃত্যুও নিশ্চিত করেছিল। মৃত্যু হয়েছে বুঝতে পেরে একটি বস্তায় বর্ষার লাশ ঢোকানো হয়। যে ১০০ টাকার লোভ দেখিয়ে গুদাম পর্যন্ত শিশু বর্ষাকে ডেকে নিয়েছিল সেই নোটটি রক্তে লাল হয়েছিল। মুদি দোকানের কর্মচারী লক্ষণ দাশ ১০০ টাকার নোটটিও বস্তায় ঢোকায়। বস্তার ভেতর বর্ষার কাপড়ও ভরে। গিঁট দেওয়ার পর পাশের নালায় বস্তাটি ফেলে দেয়। গুদামে ফিরে দেখতে পায়, পেঁয়াজের বস্তার পাশে পড়ে রয়েছে বর্ষার জুতা জোড়া। এটা তো প্রমাণ। প্রমাণ রাখা যাবে না। এটা ভেবে জুতা নিয়ে নালায় ফেলে দেয়। বর্ষাকে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ করে খুন ও প্রমাণ গায়েবের অভিযোগে গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বর চার্জশিট দাখিল করেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এতে লক্ষণ দাশকে একমাত্র আসামি করা হয়। শিকদার হোটেলের পাশের শ্যামল স্টোরের কর্মচারী ছিল সে। স্টোরটির গুদামে শিশু বর্ষাকে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে। চিপসসহ নানা কিছু কেনার জন্য শ্যামল স্টোরে প্রায় যেত বর্ষা। এ কারণে সে লক্ষণকে চিনত।
ঘটনার দিন গুদামের সামনে দাঁড়িয়েছিল লক্ষণ। তখন বর্ষা সম্ভবত দোকানের দিকে যাচ্ছিল। লক্ষণ তাকে বলে চিপস কিনতে ১০০ টাকার জন্য গোডাউনে আসো। পূর্ব পরিচিতির কারণে বর্ষা তার পিছু পিছু গোডাউনে গিয়েছিল। গুদামে আসার আগেই বর্ষার হাতে কথামতো ১০০ টাকার একটি নোট গুঁজে দেয় লক্ষণ, যা পরে রক্তাক্ত হয়। তদন্ত কর্মকর্তার দেওয়া চার্জশিটে এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
ঘটনার তিন দিন পর শিকদার হোটেলের পাশের নালা থেকে বস্তাবন্দি বর্ষার লাশ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ তদন্তে নামে। নানা তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে। একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজও সংগ্রহ করা হয়। সেই ফুটেজে ধরা পড়ে লক্ষণ দাশ। পরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতে প্রেরণ করা হলে সে বর্ষাকে ধর্ষণ, শ্বাসরোধ করে হত্যা করা, এমনকি বস্তায় ভরে লাশ নালায় ফেলার কথা স্বীকার করে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ঘটনার পর বর্ষার মা ঝর্ণা বেগম বাদী হয়ে একটি নিখোঁজ ডায়েরি করেছিলেন। লাশ উদ্ধারের পরে তিনি নগরীর কোতোয়ালী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। লক্ষণ বর্তমানে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছে।
