বিশেষ প্রতিবেদন
বন্দরনগরী চট্টগ্রামে এ বছর শীতের প্রকোপ বিগত কয়েক বছরের তুলনায় স্পষ্টভাবেই বেশি। ভোরের দিকে কুয়াশা, ঠান্ডা বাতাস এবং দিনের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকায় নগরজীবনে শীতের প্রভাব চোখে পড়ার মতো। আবহাওয়া সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনেরই একটি বহিঃপ্রকাশ।
চট্টগ্রাম অঞ্চলে সাধারণত শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ১৫–১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে একাধিক দিন তাপমাত্রা ১২–১৪ ডিগ্রিতে নেমে এসেছে। আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত শীতল বায়ুপ্রবাহ এ অঞ্চলে দীর্ঘ সময় ধরে সক্রিয় থাকায় তাপমাত্রা তুলনামূলক কমে গেছে।
নিম্নে বিগত কয়েক বছরের তুলনায় চট্টগ্রামে এই বছর তাপমাত্রা হ্রাসের নেপথ্যের কারণ সমূহের একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ করা হলো :-
হিমালয় অঞ্চল থেকে শীতল বায়ুপ্রবাহ আবহাওয়াবিদদের মতে, এ বছর হিমালয় ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ব্যাপক তুষারপাত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট শীতল ও শুষ্ক বায়ুপ্রবাহ উত্তর ভারত ও বাংলাদেশের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চট্টগ্রাম উপকূলীয় এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এই বায়ুপ্রবাহের প্রভাব এড়াতে পারেনি।
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের অনুপস্থিতি
সাধারণত শীতকালে বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ বা নিম্নচাপ সৃষ্টি হলে উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস প্রবাহিত হয়ে শীতের তীব্রতা কিছুটা কমে যায়। তবে এ বছর এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কোনো লঘুচাপ সৃষ্টি হয়নি। ফলে ঠান্ডা ও শুষ্ক আবহাওয়া দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে।
বৃষ্টিপাত কম, আর্দ্রতাও হ্রাস
চলতি মৌসুমে চট্টগ্রামে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের তুলনায় কম। বৃষ্টি না হওয়ায় বাতাসে আর্দ্রতা কমে গেছে, যা শীত অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তুলছে। বিশেষ করে ভোর ও রাতের দিকে ঠান্ডার অনুভূতি বেশি হচ্ছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার ধরন অনিয়মিত হয়ে উঠছে। কখনো অতিরিক্ত গরম, আবার কখনো অস্বাভাবিক শীত—এই চরম অবস্থার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশসহ উপকূলীয় অঞ্চলগুলো যাচ্ছে। চট্টগ্রামে এ বছরের শীত বেশি পড়াও এরই একটি উদাহরণ।
শীতের তীব্রতায় চট্টগ্রামের নিম্নআয়ের মানুষ, বিশেষ করে ফুটপাতবাসী ও পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দারা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন। শীতজনিত রোগ—সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টের প্রকোপও বেড়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে।
আবহাওয়া অফিস জানায়, জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত শীতের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে স্বাভাবিকের দিকে ফিরবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উপসংহারে এটাই বলা সমীচীন হবে, চট্টগ্রামে এ বছর শীত বেশি পড়ার পেছনে রয়েছে একাধিক প্রাকৃতিক ও জলবায়ুগত কারণ। এটি শুধু একটি মৌসুমি ঘটনা নয়; বরং পরিবর্তিত জলবায়ুর বাস্তব প্রতিচ্ছবি। সময়োপযোগী প্রস্তুতি ও সচেতনতা ছাড়া ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
