সোমবার, মার্চ ১৬, ২০২৬

‘তারেক ম্যাজিক’ : “তারেক বসন্ত” এর দ্বিতীয় ধাপ

শিশির পারিয়াল

ভূমিধ্বস বিজয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপার্সন জনাব তারেক রহমান গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করলেন এবং কাজও শুরু করে দিলেন। এই বিপুল ব্যবধানে বিজয় তিনি কিভাবে পেয়েছেন সেটা নিয়ে কোথাও নূন্যতম আলোচনাও চলছে না, বরং আলোচনা চলছে বিএনপি ২২০ – ২৩০ টি আসনে কেনো জয়লাভ করতে পারেনি সেটা নিয়ে। অবশ্য যদি নিশ্চিত কিছু সংসদীয় আসনে নিজ দলের বিদ্রোহী প্রার্থী না থাকতো তবে বিএনপির আসন সংখ্যা অবশ্যই ২২০ ছাড়িয়ে যেতো। আসলে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং আপসহীন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সুযোগ্য পুত্র হিসেবে জনাব তারেক রহমানের প্রতি আমাদের প্রত্যশা একটু বেশিই থাকবে এটাই স্বাভাবিক। এই বেশি প্রত্যাশার চাপটি সামলাতে জনাব তারেক রহমানের তেমন একটা সমস্যা হবেনা সেটা বুঝতে পারা গেছে কাজ শুরু করা মাত্রই তাঁর জারিকৃত কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে, যে সিদ্ধান্ত সমূহকে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ‘ম্যাজিক’ ই বলা যেতে পারে।

প্রথম ম্যাজিকটি জনাব তারেক রহমান দেখিয়েছেন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের দিনে। সেদিন তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জামায়াত – এনসিপি জোটের প্রবল চাপ উপেক্ষা করে সংবিধান অনুসারে শপথ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য পদে শপথ নেওয়া হতে দলীয় সংসদ সদস্যদের বিরত রাখেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, বিএনপি এপর্যন্ত সংবিধান মেনেই সবকিছু করেছে এবং ভবিষ্যতেও তাই করবে। পবিত্র সংবিধানের সম্মান রক্ষার জন্য তাঁর এই দৃঢ় অবস্থান সরকার গঠনের পূর্বেই তাঁর অবিসংবাদিত নেতৃত্বের জানান দেয় সবাইকে।

দ্বিতীয় ম্যাজিকটি বিএনপির চেয়ারম্যান দেখিয়েছেন নিজ সরকারের মন্ত্রী পরিষদ গঠনের সময়। তিনি তাঁর মন্ত্রীসভায় কয়েকজন অত্যন্ত দক্ষ এবং অভিজ্ঞ নেতাকে জায়গা দিয়েছেন। যেমন – স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী জনাব সালাহউদ্দিন আহমদ, শিক্ষা মন্ত্রী জনাব আ ন ম এহসানুল হক মিলন, অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী জনাব আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আরো অনেকেই। তবে পুরো দেশেই আলোচনা চলছে, বাংলাদেশ সরকারের যে তিনটি বিভাগ বিগত ১৮ মাসে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে যথা স্বরাষ্ট্র, শিক্ষা, ও আর্থিক বিভাগ – তিনটিতেই জনাব তারেক রহমান এমন তিনজনকে নিয়োগ দিয়েছেন যাদের সমকক্ষ বা বিকল্প স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের জন্য পুরো বাংলাদেশেও বর্তমানে খুঁজে পাওয়া যাবেনা। আবার মন্ত্রীসভা নির্বাচনে তাঁর মাস্টার স্ট্রোক হচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জনাব ড. খলিলুর রহমানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ দেওয়া। ড. খলিলুর রহমান এমন একজন ব্যক্তি যিনি একইসাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারত – এই ৪ সুপার পাওয়ারের সাথে সমান্তরাল ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখতে সক্ষম। কারো যদি মনে হয় আমি ড. খলিলুর রহমান সম্বন্ধে বাড়িয়ে বলছি তাদেরকে অনুরোধ করবো উনার ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার প্রোফাইল অধ্যয়ন করার জন্য। আবার এই সকল অভিজ্ঞতম ব্যক্তিদের সাথে জনাব তারেক রহমান মন্ত্রী পরিষদে যুক্ত করেছেন জনাব জোনায়েদ সাকী, নুরুল হক নুর, ববি হাজ্জাজ এবং শামা ওবায়েদের মতো আরো অনেক অপেক্ষাকৃত তরুণ নেতাকে যা নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের আগামীর নেতৃত্বের বিনির্মানে সহায়ক হবে। বিগত প্রধানমন্ত্রীর সাথে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যতিক্রম হচ্ছে, বিগত প্রধানমন্ত্রী এমনভাবে মন্ত্রী পরিষদ নির্বাচন করতেন যেনো ঘুরেফিরেই চূড়ান্ত ক্ষমতা তাঁর এবং তাঁর পরিবারের হাতে থেকে যায় ; কিন্তু জনাব তারেক রহমান তাঁর পিতা মাতার মতোই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে বিশ্বাসী। তাই তিনি মন্ত্রী পরিষদের সদস্য নির্বাচনের সময় আগামী দিনের নেতৃত্ব নির্মানের কথা চিন্তা করেছেন। সাবেক স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী কখনোই নিজের বিকল্প তৈরি করতে চাননি। কিন্তু জনাব তারেক রহমান এখন থেকেই নিজের বিকল্প তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। প্রবীণ ও নবীনের এহেন সহাবস্থান তৈরি করাটা হচ্ছে জনাব তারেক রহমানের উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ম্যাজিক।

তৃতীয় ম্যাজিকটি তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়া মাত্রই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার নির্দেশ দেওয়ার মাধ্যমে দেখিয়েছেন। জনাব তারেক রহমান বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি শুধুমাত্র নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য কোনো রকম প্রতিশ্রুতি দেননি। তাঁর প্রতিটি প্রতিশ্রুতির পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট পরিকল্পনা। যা কিনা দেশে ফেরা মাত্রই তাঁর উচ্চারিত সেই বিখ্যাত “আই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান” উক্তিটিরই যথার্থতা প্রমাণ করে।

চতুর্থ ম্যাজিকটি তিনি দেখিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী পদের অনেকগুলো অপ্রয়োজনীয় সুবিধা বর্জন করার মধ্যে দিয়ে। যেমন, সরকারি গাড়ির পরিবর্তে নিজের গাড়ি ব্যবহার করা, প্রধানমন্ত্রীর যাত্রা পথের দুই পাশে পুলিশ সদস্যদের উপস্থিতি বাতিল করা, প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি বহরে গাড়ির সংখ্যা কমানো, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অহেতুক ব্যবহার কমিয়ে সচিবালয়ের গুরুত্ব বাড়ানো এবং সঠিক সময়ে অফিসে উপস্থিত হওয়ার নজির স্থাপন করা। এছাড়াও সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা তো আছেই।

পঞ্চম ম্যাজিকটি তিনি দেখিয়েছেন নির্বাচনী প্রচারণা থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশের রাজনীতির অবিসংবাদিত ট্রাম্প কার্ড “ধর্ম” কে ব্যবহার না করে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেছেন, তিনি সংখ্যাগুরু এবং সংখ্যালঘু বিভাজনে যেতে ইচ্ছুক নন। তিনি বলেছেন, মুসলিম – হিন্দু – বৌদ্ধ – খ্রীষ্টান সবাই বাংলাদেশের নাগরিক। তাই সকলেই সমান অধিকার ও সুযোগ – সুবিধা ভোগ করবে। তাঁর এই বক্তব্যের শক্তিমত্তা বুঝতে পারা গেছে নির্বাচনের সময়, যখন উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সংখ্যালঘু ভোট বিএনপির বাক্সে পড়েছে। তিনি বিগত স্বৈরাচার সরকারের ন্যায় সংখ্যালঘুদের সামনে সংখ্যালঘু মন্ত্রণালয় ও সংখ্যালঘু কমিশনের মুলা ঝুলিয়ে রাখেননি। বরং তিনি ক্ষমতায় আসলে সকলের জন্য সমঅধিকার ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট আদায় করেছেন। নিকট অতীতে এধরনের শক্তিশালী সমতা পূর্ণ অবস্থান বাংলাদেশের অন্য কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব দেখাতে পারেননি। ধর্মীয় সহাবস্থান নিয়ে তাঁর অত্যন্ত শক্তিশালী বক্তব্যের পর দেশের অমুসলিম জনগণের কাছে এখন ধর্মীয় পরিচয়ের চাইতে “বাংলাদেশের নাগরিক” পরিচয়টাই বড় হয়ে উঠেছে, যেটা নিকট অতীতে ছিলো সম্পূর্ণ বিপরীত।

পরিশেষে এটাই বলবো, আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের নতুন গণতন্ত্রের পথে উত্তরণ যদি “তারেক বসন্ত” – এর প্রথম ধাপ হয় তবে দেশ গঠনে কিছু ‘ম্যাজিক্যাল ডিসিশন’ গ্রহণ হচ্ছে “তারেক বসন্ত” – এর দ্বিতীয় ধাপ। আমরা এখন “তারেক বসন্ত” – এর পরবর্তী ধাপের অপেক্ষায় থাকলাম। তবে পরবর্তী ধাপে সফলতার সাথে উত্তরণের জন্য জনাব তারেক রহমানকে তাঁর মন্ত্রী পরিষদের কিছু সদস্যের অতিকথনে লাগাম টেনে ধরতে হবে, নতুবা এইসব অতিকথক মন্ত্রীর জন্য নিকট ভবিষ্যতেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। জনাব তারেক রহমানের হাত ধরেই আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ সকল বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে এবং সকল দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে বিশ্ব দরবারে আবার মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আজকের লেখাটি এখানেই শেষ করলাম।

শিশির পারিয়াল
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল

সম্পর্কিত খবর

রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদে সংসদ থেকে জামায়াত ও এনসিপির ওয়াকআউট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ দেওয়ার প্রতিবাদে সংসদ বর্জন ও ওয়াকআউট করেছে জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির সংসদ...

ইরানে চরম হামলার হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের

মধ্যপ্রাচ্যের চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্যেই  মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টে ইরানের উদ্দেশ্যে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলছেন “আজ এই পাগলাটে নোংরাদের কী হয়...

আমরা সংসদে যাচ্ছি সংস্কার আদায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে : নাহিদ ইসলাম

আগামী ১২ তারিখ থেকে শুরু হতে যাওয়া ত্রয়োদশ জাতীয়  সংসদের প্রথম অধিবেশনে ফ্যাসিস্ট কৃতক নিয়োগকৃত রাষ্ট্রপতির বক্তব্য শুনতে তারা সংসদে যাচ্ছেন না বলে জানিয়েছেন...

ভারতের দুটি ট্যাংকার নিরাপদে হরমুজ প্রণালী অতিক্রম করেছে

হরমুজ প্রণালিতে ইরানের অব্যাহত আক্রমণ ও হুমকি এবং জাহাজ চলাচলে স্থবিরতার মধ্যেই ভারতের দুটি এলপিজি ট্যাংকার চ্যানেলটি নিরাপদে অতিক্রম করার সংবাদ পাওয়া গেছে। আরও...

বাংলাদেশ ভারত থেকে ৫ হাজার টন ডিজেল আমদানি করছে

বাংলাদেশ পেট্রলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে বাংলাদেশে আজ মঙ্গলবার ১০ মার্চ পাইপলাইনের মাধ্যমে ৫ হাজার টন ডিজেল আসছে। বিপিসির বাণিজ্য...

মির্জা আব্বাসের মস্তিষ্কে দুই দফা অস্ত্র পাচার সম্পন্ন

রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাসের মস্তিষ্কে পরপর দুই দফার অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। শুক্রবার ১৩ মার্চ বিকেল...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত