দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালে যান চট্টগ্রাম-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম। বেলা একটার দিকে পরিদর্শন শেষ করে তিনি হাসপাতাল ত্যাগ করেন। শপথ গ্রহণের প্রায় এক সপ্তাহ পর এলাকায় এসে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন ও নির্বাচনে আহত নেতাকর্মীদের দেখতে যান। তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, যাঁদের দেখতে তিনি গিয়েছিলেন, তাঁদের কেউ আগে থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন না।
সংসদ সদস্য আসবেন, এমন খবর ছড়িয়ে পড়তেই সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) সকালে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে একসঙ্গে ভর্তি হন ২৩ জন ‘আহত’ ব্যক্তি। দুপুরে পরিদর্শন শেষে এমপি হাসপাতাল ছাড়ার পরপরই তাদেরও আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিকেলের মধ্যেই তাঁরা হাসপাতাল ত্যাগ করেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
হাসপাতাল সূত্র আরও জানায়, আগের দিন হাসপাতালে ৭৮ জন রোগী ভর্তি থাকলেও সোমবার সকালে অর্ধেক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যান। এমপির আগমন ঘিরে আগে থেকে ভর্তি থাকা শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত কয়েকজন রোগীকে ওয়ার্ড থেকে বের করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের জায়গায় সাময়িকভাবে ভর্তি করা হয় আহত নেতাকর্মীদের। এমপি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিট দখল করে রাখা ব্যক্তিরাও হাসপাতাল ত্যাগ করেন। এতে চিকিৎসা নিতে আসা প্রকৃত রোগী ও তাঁদের স্বজনেরা ভোগান্তিতে পড়েন। জরুরি বিভাগ ও ওয়ার্ড এলাকায় অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং চিকিৎসাসেবায় বিলম্ব হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
আগে থেকে ভর্তি থাকা আনোয়ারার মাজারগেট এলাকার মো. আলমগীর ও পীরখাইন এলাকার মোহাম্মদ হোসেন অভিযোগ করেন, তাঁদের নির্ধারিত শয্যা থেকে সরিয়ে নতুন করে ভর্তি হওয়া ব্যক্তিদের সেখানে তোলা হয়। পরে এমপি চলে যাওয়ার পর তাঁরা আবার শয্যা ফিরে পান।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে ২৩ জন ‘আহত’ ব্যক্তি জরুরি বিভাগে এসে ভর্তি হন। তাঁদের ভাষ্য ছিল, সদ্যসমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন বিভিন্ন স্থানে মারামারি-সংঘর্ষে আহত হন তাঁরা। পরে নগরের বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। সেখান থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর আবার অসুস্থ বোধ করায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন। তাঁদের অনেকের হাত-পাসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যান্ডেজ মোড়ানো ছিল। বেলা ১১টার দিকে ভর্তি হওয়া এসব রোগীর মধ্যে বারশত দুধকুমড়া গ্রামের আলী হোসেন (৩৯), মঈন উদ্দিন (৩২), নাছির খান (২৭), পরৈকোড়া ইউনিয়নের নেজাম উদ্দিন (৪২) ও উত্তম তালুকদার (৫০) ছিলেন। বিকেলের মধ্যেই তাঁরা রিলিজ নিয়ে চলে যান।
হাসপাতালে ভর্তি থাকা এক রোগী জানান, কয়েকদিন ধরে তিনি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। সকালে তাঁদের কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরে তাঁদের সিটে মারামারিতে আহত কয়েকজনকে রাখা হয়। তাঁদের সঙ্গে এমপি কথা বলেন ও ছবি তোলেন। এমপি চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরাও চলে যান।
আরেক রোগী মোহাম্মদ হোসেন (৫০) বলেন, ৩০ থেকে ৪০ জন লোক এসে জানান, এখানে ভিআইপি রোগী আসবেন, তাই তাঁদের নেমে যেতে হবে। এরপর ওই ব্যক্তিরা তাঁদের সিটে অবস্থান নেন। পরে এমপি এলে তাঁর ছেলে প্রত্যেককে দুই হাজার টাকা করে দিয়ে চলে যান। এ সময় তাঁরা বাইরে ছিলেন এবং তাঁদের সঙ্গে কেউ কথা বলেননি।
হাসপাতাল পরিদর্শনকালে সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম বলেন, ‘নৈতিকতার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।’ তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন তাঁর ছেলে সাওয়াজ নিজাম সনি, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহাতাব উদ্দিন চৌধুরী, থানার অফিসার ইনচার্জ জুনায়েদ চৌধুরী, উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক মোশাররফ হোসেন, সাবেক সাধারণ সম্পাদক শফিউল আলম জাকারিয়া চৌধুরী জকুসহ স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
