বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ৫৫ বছর পর আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুনভাবে আলোচনায় এসেছে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী কতৃক পরিচালিত গণহত্যার বিষয়টি। গত শুক্রবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে পাকিস্তান বাহিনীর চালানো গণহত্যাকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি এ ঘটনায় সহযোগিতার অভিযোগে বাংলাদেশে নিবন্ধিত ও বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর বিচার দাবিতে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। প্রস্তাবটি পাস হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তা বহুমাত্রিক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা যায়।
১. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও নৈতিক শক্তি বৃদ্ধি
যদি মার্কিন কংগ্রেস আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তাহলে তা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার একটি বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হবে। আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বিভ্রান্তি বা বিতর্ক কমবে এবং রাষ্ট্রীয় বয়ান আরও শক্তিশালী হবে। এতে করে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার রাজনৈতিক ও নৈতিকভাবে শক্ত অবস্থানে যেতে পারে।
২. যুদ্ধাপরাধের প্রশ্নে নতুন বিতর্ক
জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে বিচার দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উত্থাপিত হলে দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধাপরাধের বিচার ইস্যুটি আবারও জোরালোভাবে সামনে আসবে। অতীতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে অনেক বিচার সম্পন্ন হলেও অভিযুক্ত জামায়াতে ইসলামী এই বিচার প্রক্রিয়াকে বারবার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে সমালোচনা করেছে। নতুন এই প্রস্তাব সেই বিতর্ককে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে এবং জামায়াতকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে।
৩. বিরোধী রাজনীতির ওপর চাপ
মার্কিন কংগ্রেসের প্রস্তাব পাস হলে বর্তমান বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বিরোধী দল তথা জোটবদ্ধ জামায়াত ও এনসিপির উপর ওপর আন্তর্জাতিক চাপ তৈরি হতে পারে। এতে করে রাজনৈতিক জোট কাঠামোতে পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
৪. ক্ষমতাসীন দলের কূটনৈতিক সুবিধা
বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রী পরিষদ এই প্রস্তাবকে নিজেদের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরার একটি সুযোগ পাবে। বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্বে মানবাধিকার ও গণতন্ত্র ইস্যুতে বাংলাদেশের যে সমালোচনা রয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এই স্বীকৃতি সরকারকে একটি প্রতিরোধমূলক অবস্থান নিতে সাহায্য করতে পারে। ফলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনার একটি নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের সম্পর্ক আরও উন্নত মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।
৫. রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়ার আশঙ্কা
এ ধরনের প্রস্তাব দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক বিভাজন আরও তীব্র করতে পারে। একদিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষে অবস্থান নেওয়া শক্তিগুলো এটি স্বাগত জানাবে, অন্যদিকে বিরোধী শিবিরে এর রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি এবং বিরুদ্ধ শক্তি মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসতে পারে।
৬. বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসন
এই প্রস্তাবটি যদি গৃহীত হয় এবং মার্কিন সরকার ১৯৭১ সালের গণহত্যাকে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয় তখন দেশে বিদেশে বর্তমান জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এবং দেশের অভ্যন্তরে তাদেরকে নিষিদ্ধ করার দাবি উঠতে পারে। এবং তখন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকে নেতৃত্ব দেওয়া বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পুনরায় দেশের রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হওয়ার একটা সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং আওয়ামী লীগের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের উপর দেশি বিদেশি চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, বিশেষ করে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন এবং রাশিয়া – চীন – ভারত বলয় থেকে। আর এমনিতেও গণহত্যায় সহায়তা করার অভিযোগে অভিযুক্ত হলে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পূর্ণভাবে নড়বড়ে হয়ে যাবে এবং সেই রাজনৈতিক শূন্যতার সুযোগে আওয়ামী লীগের দেশের রাজনীতিতে পুনরাগমন ঘটতে পারে।
৭. তরুণ প্রজন্ম ও ইতিহাসচর্চায় প্রভাব
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার আগ্রহ বাড়াতে পারে। শিক্ষাঙ্গন ও গণমাধ্যমে এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় পরিচয় নির্মাণে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
মার্কিন কংগ্রেসের এই প্রস্তাবটি পাস হলে তা শুধু একটি কূটনৈতিক ঘটনা নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনীতির ভেতরে গভীর প্রতিফলন ফেলতে পারে। ইতিহাস, বিচার, কূটনীতি ও ক্ষমতার রাজনীতির সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে এই উদ্যোগটি দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
শিশির পারিয়াল
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল
