ব্রিকস ও সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের (এসসিও) অংশীদার সদস্য হওয়ার আবেদনে বাংলাদেশকে সমর্থন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে চীন। আজ শুক্রবার প্রকাশিত চীন ও বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে এই তথ্য জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২২ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করেন। সফরকালে তিনি দালিয়ানে অনুষ্ঠিত সামার দাভোস সম্মেলন ২০২৬-এ অংশ নেন। সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠক এবং ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান ঝাও লেজির সঙ্গে সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করে বিস্তৃত ঐকমত্যে পৌঁছায় দুই দেশ।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ১৯৭৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দেশের রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা, ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব এবং বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা ধারাবাহিকভাবে জোরদার হয়েছে। চীন চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচন ও নতুন সরকারের দায়িত্ব গ্রহণকে অভিনন্দন জানিয়ে সরকারের শাসনব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানায়। একই সঙ্গে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি বাস্তবায়নের প্রশংসা করে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মনে করে, চীনের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাংলাদেশের জন্য নতুন উন্নয়ন সুযোগ সৃষ্টি করবে।
দুই দেশ উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও বাড়ানো, রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সরকার, আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে। পাশাপাশি পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ে কৌশলগত সংলাপ এবং কূটনীতি ও প্রতিরক্ষা বিষয়ে ‘২+২’ সংলাপ ব্যবস্থা চালুর সম্ভাবনা অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যৌথ ঘোষণায় উভয় দেশ একে অপরের সার্বভৌমত্ব, স্বাধীনতা, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে দৃঢ় সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। বাংলাদেশ পুনরায় এক চীন নীতির প্রতি অটল সমর্থন জানিয়ে বলেছে, বিশ্বে একটিই চীন রয়েছে। তাইওয়ান গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং বেইজিংই সমগ্র চীনের একমাত্র বৈধ সরকার। বাংলাদেশ যেকোনো ধরনের ‘তাইওয়ানের স্বাধীনতা’ প্রচেষ্টার বিরোধিতা এবং চীনের জাতীয় পুনঃএকত্রীকরণ উদ্যোগের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। অন্যদিকে চীন বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা এবং জাতীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের পথ অনুসরণের অধিকারের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।
দুই দেশ বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) কাঠামোর আওতায় উচ্চমানের সহযোগিতা জোরদার এবং উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়েছে। চীন বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন, সহনশীলতা বৃদ্ধি এবং বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পাশাপাশি জনকল্যাণমূলক ক্ষুদ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা অব্যাহত রাখার আশ্বাস দিয়েছে।
বাণিজ্য, ই-কমার্স, শিল্প ও সরবরাহ শৃঙ্খল এবং বিনিয়োগ সহযোগিতা জোরদার করারও সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশকে শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দেওয়ার জন্য চীনের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে ঢাকা। একই সঙ্গে বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনা প্রতিষ্ঠানের জন্য অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দুই দেশ মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য ও যোগাযোগ, সবুজ জ্বালানি, সৌর প্রযুক্তি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং আঞ্চলিক সংযোগ বৃদ্ধিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের নতুন সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, পানি পরিকল্পনা, বন্যা পূর্বাভাস, নদী খনন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং প্রযুক্তি বিনিময়ে সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে একমত হয়েছে দুই দেশ।
চীন জানিয়েছে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে নিজেদের সক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে সহায়তা দেবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা দ্রুত শেষ করতে দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি সামুদ্রিক বিষয়েও সহযোগিতা জোরদার করা হবে।প্রতিরক্ষা খাতে সফর, প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা বিনিময়সহ সহযোগিতা বাড়ানো এবং জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে পারস্পরিক সমন্বয় বজায় রাখার বিষয়েও একমত হয়েছে দুই দেশ।
২০২৫ সালে কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি এবং ‘চীন-বাংলাদেশ জনসম্পর্ক বর্ষ’ সফলভাবে উদ্যাপনের প্রশংসা করে দুই দেশ। গণমাধ্যম, থিংকট্যাংক, শিক্ষা, চলচ্চিত্র, প্রকাশনা, যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতিতে সহযোগিতা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। চীন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ অব্যাহত রাখবে। পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা, মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানো হবে। ইউনান প্রদেশসহ চীনের বিভিন্ন স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে সহযোগিতাকেও স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ।
চীন জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের আরও বড় ভূমিকা পালনের প্রতি সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ এবং সাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশনের অংশীদার হওয়ার আবেদনের প্রতিও সমর্থন ঘোষণা করে। দুই দেশ জাতিসংঘভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের নীতিমালা সমুন্নত রাখার পাশাপাশি সমতা ও বহুমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক বৈশ্বিক অর্থনীতি গড়ে তোলার পক্ষে মত দেয়।
রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংকট সমাধানে চীনের গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেছে বাংলাদেশ। চীন মানবিক সহায়তা প্রদানের জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করে এবং বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজে বের করার পক্ষে সমর্থন জানায়। এই প্রক্রিয়ায় চীন ভবিষ্যতেও সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সফরকালে উন্নয়ন সহযোগিতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কৃষি, শিক্ষা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ এবং গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে একাধিক সহযোগিতা চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। সফরের শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীন সরকার ও জনগণের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানান এবং সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশের সফরের জন্য চীনের শীর্ষ নেতৃত্বকে আমন্ত্রণ জানান।
