মেক্সিকো ২ : ৩ ইংল্যান্ড
বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে স্বাগতিক মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছে ইংল্যান্ড। ঐতিহাসিক আসতেকা স্টেডিয়ামে ৯০ ম্যাচে মেক্সিকোর মাত্র তৃতীয় হার এটি।
ম্যাচের প্রথম ৩৫ মিনিটে মেক্সিকোর দাপট বেশি থাকলেও পরের দুই মিনিটের মধ্যে দুটি গোল করে জুড বেলিংহ্যাম এগিয়ে দেন ইংলিশদের। একটু পরই হুলিয়ান কিনোনেসের গোলে ব্যবধান কমায় মেক্সিকো। দ্বিতীয়ার্ধে পেনাল্টিতে গোল করেন হ্যারি কেইন, পেনাল্টিতেই একটি ফিরিয়ে দেন রাউল হিমেনেস। ৫৪তম মিনিটে সরাসরি লল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ইংলিশ ডিফেন্ডার জ্যারেল কুয়ান্সা। নির্ধারিত সময় ও যোগ করা সময় মিলিয়ে বাকি ৪৮ মিনিটে ১০ জন নিয়ে খেলেও জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে টমাস টুখেলের দল। শেষ সময়ে প্রবল চাপের মুখেও দারুণ মানসিক শক্তির ছাপ রাখে ইংলিশরা।
বৈরি আবহাওয়ার কারণে মেক্সিকো সিটিতে ম্যাচটি শুরু হয় এক ঘণ্টা দেরিতে। ম্যাচের প্রথম মিনিটেই লুইস রোমোকে বাজে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন ডেক্লান রাইস। এরপর অনুমিতভাবেই অবিরাম চাপ তৈরি করতে থাকে মেক্সিকো। ইংলিশরা যখনই বল পায়, তখনই গ্যালারি থেকে ভেসে আসে দুয়োর সুর, মাঠেও তাদের কোণঠাসা করে ফেলেন মেক্সিকানরা। পঞ্চদশ মিনিটে গোলের সুবাস পেয়েও হারায় মেক্সিকো। রবের্তো আভারাদোর দুর্দান্ত ক্রসে প্রায় শুয়ে পড়ে চোখধাঁধানো এক হেড করেন হিমেনেস। কিন্তু ততটাই দর্শনীয়ভাবে ঝাঁপিয়ে এক হাতে বল বাইরে পাঠান ইংলিশ গোলকিপার জর্ডান পিকফোর্ড।সেখান থেকে পরপর দুটি কর্নার পায় মেক্সিকো। তবে তাদের চাপ সামলে গুছিয়ে ওঠার চেষ্টা করে ইংল্যান্ড। গোলে প্রথম শট নেয় তারা ২৬তম মিনিটে। বাঁদিক দিয়ে দারুণভাবে ঢুকে শট নেন অ্যান্থনি গর্ডন। তবে মেক্সিকোর গোলকিপার রাউল রাহনেল ধরে ফেলেন সহজেই।
৩৭তম মিনিটে গুলির বেগের পাল্টা আক্রমণে এগিয়ে যায় ইংল্যান্ড। গোলকিপার পিকফোর্ড বল ধরে দ্রুত বাড়ান রাইসের দিকে। তিনি চোখের পলকে বল নিয়ে ওপরে ওঠে বক্সের কাছে দেন সাকার দিকে। সেখানে হেসুস গাইয়ার্দোকে এড়িয়ে বক্সের মাঝামাঝি চমৎকার ক্রস করেন সাকা। ছুটে এসে নিচু হয়ে নিখুঁত ডাইভিং হেডে বল জালে জড়ান বেলিংহ্যাম। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবার এই মাঠে পিছিয়ে পড়ে মেক্সিকো। এবারের বিশ্বকাপেও প্রথমবার বল ঢোকে তাদের জালে।পরের মিনিটেই মাঝমাঠে হিলবার্তো মোরার কাছ থেকে বল কেড়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠে ইংলিশরা। বেলিংহ্যাম বল ধরে এগিয়ে হ্যারি কেইনের কাছে দেন। বক্সের ডান পাশ থেকে কেইন আবার বাড়ান মাঝে। জটলার মধ্যে স্লাইড করে বলে পা ছুঁইয়ে দ্বিতীয়াবার উল্লাসে মেতে ওঠেন বেলিংহ্যাম।
হতভম্ব মেক্সিকো দ্রুতই জেগে উঠে জবাব দেয়।৪২তম মিনিটে প্রায় ৪০ মিটার দূর থেকে আভারাদোর ফ্রি কিকে বক্সের ভেতর জটলার মধ্যে এজ্রি কন্সার পায়ে লেগে বল আসে একটু পেছনে। সেখানে ফাঁকায় অপেক্ষায় ছিলেন কিনোনেস। ঠাণ্ডা মাথায় ভলিতে পিকপোর্ডকে পরাস্ত করেন এই ফরোয়ার্ড। যোগ করা সময়ে তিন দফা গোলের সম্ভাবনা জায়গায় স্বাগতিকরা। হিমেনসের বাম পায়ের শট সামান্য একটুর জন্য পোস্টের বাইরে দিয়ে চলে যায়। পরের মিনিটে তার হেড দারুণ রিফ্লেক্সে ফিস্ট করে ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন পিকফোর্ড। একটু পর কর্নার থেকে জটলা পেরিয়ে গোলের একদম মুখে বল পেয়ে যান সেসার মন্তেস। তিনি বল জালে পাঠানোর মুহূর্তে অবিশ্বাস্যভাবে আচমকা পা বাড়িয়ে বল বাইরে পাঠান বেলিংহ্যাম।
দ্বিতীয়ার্ধে প্রথম সম্ভাবনা জাগায় ইংল্যান্ড। ৪৯তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নিকো ও’রাইলির গড়ানো শট পোস্টে লেগে ফিরে আসে। একটু পর ইংল্যান্ডের সেই বড় ধাক্কা। গাইয়ার্দোকে অযথাই বাজে ট্যাকল করেন কুয়ান্সা। রেফারি শুরুতে তা খেয়াল করেননি। সেই ফাউলের সূত্রে দুই দলের ডাগআউটে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একটু পর ভিএআর দেখে কুয়ান্সাকে লাল কার্ড দেখান রেফারি।
তবে তাতে টালমাটাল না হয়ে লড়ে যায় ইংলিশরা। মিনিট চারেক পরই মেলে পেনাল্টি। দ্রুতগতিতে বক্সে ঢুকে পড়া গর্ডনকে থামাতে গিয়ে ফেলে দেন গোলকিপার রাহনেল। পরে কেইনের পেনাল্টি শটে ঠিক দিকে ডাইভ দিলেও ঠেকাতে পারেননি মেক্সিকোর গোলকিপার। বুলেট গতির নিখুঁত শট আশ্রয় নেয় জালে। চলতি মৌসুমে ক্লাব ও দেশ মিলিয়ে কেইনের ৭৩তম গোল সেটি। ছয় মিনিট পর কেইনের ফাউলেই ভিএআর দেখে পেনাল্টি দেন রেফারি। বুদ্ধিদীপ্ত শটে ব্যবধান কমান হিমেনেস। গ্যালারির তুমুল হুল্লোড়ের সঙ্গে মাঠেও উত্তেজনা ছড়ায়। হলুদ কার্ড দেখেন ও’রাইলি ও হোর্হে সানচেজ।
দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের পর জেড স্পেন্স ও ডান বার্নকে নামিয়ে রক্ষণে মনোযোগী হয় ইংল্যান্ড। মেক্সিকো চেষ্টা করে যেতে থাকে। ৮১তম মিনিটে ফাঁকায় থেকেও হেড ঠিকমতো নিতে পারেনি আলভারেস। সান্তিয়াগো হিমেনেসের ভলি চলে যায় বাইরে দিয়ে। ৮৮তম মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে আলভারো ফিদালগোর শট সহজেই ধরে নেন পিকফোর্ড। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা হয় ১১ মিনিট। খেলা চলে ১২ মিনিটের বেশি। আক্রমণের পর আক্রমণ করে মেক্সিকো। কিন্তু তাদের সব প্রচেষ্টা প্রতিহত হয় ইংলিশদের রক্ষণ দেয়ালে এবং ১৯৬৬ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড পৌঁছে যায় নকআউট পর্বের পরবর্তী রাউন্ড কোয়ার্টার ফাইনালে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে ব্রাজিলকে বিদায় করে দেওয়া নরওয়ে ও নরওয়ের গোলমেশিন হল্যান্ড।
