মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক গত চার দশকেরও বেশি সময় ধরে অবিশ্বাস, নিষেধাজ্ঞা, প্রক্সি সংঘাত এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে ঘিরে টানাপোড়েনের প্রতীক। বিভিন্ন সময়ে উভয় দেশ আলোচনার টেবিলে বসলেও একটি স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি। সাম্প্রতিক সময়েও যুদ্ধবিরতি ও আলোচনা শুরুর নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা দ্রুত ভেঙে পড়েছে এবং উভয় পক্ষ আবারও সামরিক সংঘাতের দিকে অগ্রসর হচ্ছে।
সমঝোতা বারবার ব্যর্থ হওয়ার প্রধান কারণ
১. পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে মৌলিক মতপার্থক্য
সমঝোতা ব্যর্থ হওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হলো ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি। যুক্তরাষ্ট্র চায় ইরান কার্যত এই সক্ষমতা ত্যাগ করুক বা কঠোর আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণে আনুক। অন্যদিকে ইরান দাবি করে, শান্তিপূর্ণ উদ্দেশ্যে পারমাণবিক প্রযুক্তি উন্নয়ন তার সার্বভৌম অধিকার এবং এটি কোনোভাবেই পরিত্যাগ করবে না। এই মৌলিক অবস্থানগত বিরোধই আলোচনাকে বারবার অচল করে দেয়।
২. নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নিয়ে অবিশ্বাস
ইরান চায় আগে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও জব্দকৃত সম্পদ মুক্ত করা হোক। যুক্তরাষ্ট্র চায় আগে ইরান তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক। ফলে “কে আগে ছাড় দেবে”—এই প্রশ্নেই আলোচনা আটকে যায়।
৩. আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও প্রক্সি রাজনীতি
লেবানন, সিরিয়া, ইরাক, ইয়েমেন এবং গাজাকে কেন্দ্র করে ইরানপন্থী বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর কার্যক্রম যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের উদ্বেগের অন্যতম কারণ। ইরান আবার এসবকে নিজেদের প্রতিরক্ষামূলক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখে। ফলে একটি ইস্যুর সমাধান হলেও অন্য ইস্যু নতুন সংকট তৈরি করে।
৪. পারস্পরিক আস্থার চরম সংকট
বিগত কয়েক দশকে একাধিক চুক্তি, নিষেধাজ্ঞা, সামরিক হামলা ও পাল্টা হামলার ইতিহাস উভয় দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। ফলে আলোচনায় অগ্রগতি হলেও সামান্য ঘটনার জের ধরে পুরো প্রক্রিয়া ভেঙে পড়ে।
৫. অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ
যুক্তরাষ্ট্রে প্রশাসন পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইরান নীতিও পরিবর্তিত হয়। একইভাবে ইরানের অভ্যন্তরেও কট্টরপন্থী ও সংস্কারপন্থীদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। ফলে আলোচনাকারীরা দীর্ঘমেয়াদি নিশ্চয়তা দিতে পারেন না। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন দুই দেশের মধ্যে শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ইসরায়েলি লবি এবং ইরানের বিপ্লবী বাহিনী বা আইআরজিসি। এই দুই পক্ষই শান্তি চুক্তি বাস্তবায়িত হলে নিজেদের স্বার্থের হানি ঘটবে এই আশঙ্কা থেকে শান্তি চুক্তি ভন্ডুল করে দিতে তৎপর রয়েছে।
কেন আবার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে?
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার কাঠামো ভেঙে পড়ার পর উভয় দেশ একে অপরের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা, বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার অভিযোগ, পাল্টা বিমান হামলা এবং নতুন নিষেধাজ্ঞা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এতে কূটনৈতিক অগ্রগতির পরিবর্তে সামরিক প্রতিক্রিয়াই প্রধান হয়ে উঠেছে।
যুদ্ধের সম্ভাবনা বৃদ্ধির পেছনে আরও কয়েকটি কারণ রয়েছে—
পারস্য উপসাগরে উভয় পক্ষের সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি।
ইসরায়েল–ইরান উত্তেজনার প্রভাব।
জ্বালানি নিরাপত্তা ও হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত গুরুত্ব।
পারস্পরিক প্রতিশোধমূলক হামলার ধারাবাহিকতা।
কূটনৈতিক যোগাযোগের কার্যকর চ্যানেল দুর্বল হয়ে পড়া।
সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাব
যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ শুরু হয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।
বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা বিঘ্নিত হতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন মুদ্রাস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যে নতুন শরণার্থী সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
বড় শক্তিগুলোর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।
করণীয় কী?
একটি টেকসই সমাধানের জন্য কয়েকটি বাস্তবধর্মী পদক্ষেপ জরুরি—
প্রথমত, পারমাণবিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ধাপে ধাপে একটি যাচাইযোগ্য সমঝোতা গড়ে তুলতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও ইরানের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নকে সমন্বিত ও পর্যায়ক্রমিক কাঠামোর মধ্যে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, পাকিস্তান, কাতার বা অন্য নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী দেশের মাধ্যমে নিয়মিত সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে।
চতুর্থত, হরমুজ প্রণালীকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য নিরাপদ রাখার বিষয়ে আলাদা নিরাপত্তা চুক্তি করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোতে উপসাগরীয় রাষ্ট্র, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি বহুপক্ষীয় সংলাপ চালু করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের বিরোধ কেবল দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা নয়; এটি বিশ্ব অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতীতের অভিজ্ঞতা দেখায়, সামরিক সংঘাত কোনো স্থায়ী সমাধান আনতে পারেনি। অপরদিকে সংলাপ যতবারই শুরু হয়েছে, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, পারস্পরিক অবিশ্বাস এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতির কারণে তা ভেঙে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন যুদ্ধ শুধু দুই দেশের জন্য নয়, সমগ্র বিশ্বের জন্যই ব্যয়বহুল ও অনিশ্চিত হবে। তাই শক্তি প্রদর্শনের পরিবর্তে আস্থা পুনর্গঠন, বাস্তবসম্মত সমঝোতা এবং ধারাবাহিক কূটনৈতিক উদ্যোগই হতে পারে এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট থেকে বেরিয়ে আসার সবচেয়ে কার্যকর পথ।
