শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

এক যুগের অবসান, এক কিংবদন্তির অমরত্ব

বিদায়, লিও! আন্তর্জাতিক ফুটবলে শেষ হলো মেসির মহাকাব্য

সম্পাদকের ডেস্ক

ফুটবল মাঠে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন একটি ঘোষণা শুধু একটি খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারের অধ্যায় শেষ করে না—শেষ করে একটি যুগ। সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬, তেমনই এক মুহূর্তের সাক্ষী হলো বিশ্ব ফুটবল। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ও ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মহাতারকা লিওনেল মেসি ঘোষণা দিয়েছেন, তিনি আর আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলবেন না।

৩৯ বছর বয়সী মেসির এই ঘোষণা যেন ফুটবলপ্রেমীদের জন্য বজ্রপাতের মতো। যদিও ২০২৬ বিশ্বকাপের পর থেকেই তাঁর অবসর নিয়ে জল্পনা চলছিল, তবু মেসির মুখ থেকে চূড়ান্ত ঘোষণা আসার পর বাস্তবতাটি এখন আর এড়ানোর উপায় নেই। আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে আর দেখা যাবে না সেই চেনা ১০ নম্বর জার্সি, সেই বাঁ-পায়ের জাদু, সেই অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং কিংবা গোলের পর আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই পরিচিত মুখ।

দুই দশকের এক মহাকাব্য
২০০৫ সালে মাত্র ১৮ বছর বয়সে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে অভিষেক। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এই দীর্ঘ যাত্রায় মেসি খেলেছেন ২০৭টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ, করেছেন ১২৫ গোল—দুটিই আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে অসাধারণ মাইলফলক।

কিন্তু মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শুধু পরিসংখ্যানের গল্প নয়। এটি ব্যর্থতা, সমালোচনা, কান্না, প্রত্যাবর্তন এবং শেষ পর্যন্ত পরম গৌরব অর্জনের এক অবিশ্বাস্য উপাখ্যান।

একসময় তাঁকে বলা হতো—‘বার্সেলোনার মেসি, আর্জেন্টিনার মেসি নন।’ জাতীয় দলের হয়ে বড় কোনো শিরোপা না জেতায় তাঁর সমালোচনাও কম হয়নি। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার—সব মিলিয়ে আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির যাত্রা যেন বারবার বিষাদে থমকে যাচ্ছিল।

২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণাও দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসা তাঁকে ফিরিয়ে আনে। আর সেই প্রত্যাবর্তনই শেষ পর্যন্ত রচনা করে ইতিহাস।

কোপা আমেরিকা দিয়ে শুরু, বিশ্বকাপ দিয়ে পূর্ণতা
২০২১ সালে ব্রাজিলের মাটিতে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজিলকে হারিয়ে প্রথম বড় আন্তর্জাতিক শিরোপা জেতেন মেসি। দীর্ঘ ২৮ বছরের শিরোপাখরা কাটিয়ে আর্জেন্টিনার ফুটবলে আসে নতুন সূর্যোদয়। পরবর্তীতে ২০২৪ সালে আরও একটি কোপা আমেরিকা জিতে মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার আরও সমৃদ্ধ হয়।

তবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় স্বপ্নটি তখনও অপূর্ণ—বিশ্বকাপ জয়।

২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপ। পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে অসাধারণ পারফরম্যান্সের পর ফাইনালে ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক ম্যাচ। টাইব্রেকারে জয়। আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন।

যে ট্রফির জন্য তাঁকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল, যে স্বপ্নের জন্য তাঁকে অসংখ্যবার ব্যর্থতার তীর সহ্য করতে হয়েছিল—সেই বিশ্বকাপ ট্রফি অবশেষে উঠল তাঁর হাতে। ম্যারাডোনার উত্তরসূরি হিসেবে মেসির সিংহাসন তখনই যেন পূর্ণতা পেল।

শেষ বিশ্বকাপেও মেসি
২০২৬ বিশ্বকাপ ছিল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনাকে নিয়েো পৌঁছে যান ফাইনালে। কিন্তু শিরোপা ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা; ফাইনালে স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে রানার্সআপ হয় তারা। আর সেই ম্যাচটিই শেষ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির শেষ ম্যাচ।

অর্থাৎ বিশ্বকাপের মঞ্চেই শেষ হলো তাঁর আন্তর্জাতিক অভিযাত্রা—যে মঞ্চ তাঁকে দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ, আবার বিদায়ের মুহূর্তেও দিয়েছে একটুখানি বিষাদ।

‘আর কিছু দেওয়ার নেই’—কেন এই সিদ্ধান্ত?
মেসির অবসর ঘোষণায় আবেগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাস্তবতার স্বীকৃতিও। তিনি দীর্ঘ সময় ধরে জাতীয় দলের জন্য নিজের সর্বস্ব উজাড় করে দিয়েছেন। নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সামনে জায়গা করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও তাঁর বক্তব্যে উঠে এসেছে।সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও এসেছে গভীর শোক। তাঁর বাবা ও দীর্ঘদিনের এজেন্ট হোর্হে মেসির মৃত্যু মেসির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনায় বড় প্রভাব ফেলেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে। ফলে এই অবসর কেবল বয়সের কারণে নয়; বরং দীর্ঘ ফুটবলযাত্রার পর নিজের জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে যাওয়ার একটি সচেতন সিদ্ধান্তও।

মেসি চলে যাচ্ছেন, কিন্তু মেসি-যুগ কি শেষ হবে?
একজন খেলোয়াড় জাতীয় দল থেকে অবসর নিতে পারেন। কিন্তু তাঁর তৈরি করা ইতিহাস থেকে একটি জাতি কিংবা একটি প্রজন্ম অবসর নিতে পারে না।

মেসির সঙ্গে আর্জেন্টিনার ফুটবলের সম্পর্ক ছিল অদ্ভুত আবেগের। শুরুতে সমালোচনা, পরে ভালোবাসা, আর শেষ পর্যন্ত প্রায় পূজার পর্যায়ে পৌঁছে যাওয়া—এই পরিবর্তনের সাক্ষী পুরো বিশ্ব।

একসময় যে মেসিকে আর্জেন্টিনার ব্যর্থতার জন্য দায়ী করা হতো, সেই মেসিই পরে হয়ে উঠেছেন আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক। তিনি শিখিয়েছেন—ব্যর্থতা একজন কিংবদন্তিকে ছোট করে না; বরং বারবার ফিরে এসে সফল হওয়াই কিংবদন্তির প্রকৃত পরিচয়।

পরিসংখ্যানের বাইরেও যে মেসি
১২৫ আন্তর্জাতিক গোল, ২০৭ ম্যাচ, বিশ্বকাপ, দুটি কোপা আমেরিকা—এই সংখ্যাগুলো মেসির অর্জনের একটি অংশ মাত্র। মেসির সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো হলো—তিনি ফুটবলকে আবারও কবিতার মতো করে তুলেছেন। একজন খেলোয়াড় কীভাবে একসঙ্গে গতি, নিয়ন্ত্রণ, বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা ও গোল করার ক্ষমতাকে শিল্পে পরিণত করতে পারেন—মেসি তার জীবন্ত উদাহরণ।

তাঁর বাঁ পায়ের ফুটবল যেন ছিল এক ধরনের ভাষা। প্রতিপক্ষের পাঁচ-ছয়জন খেলোয়াড়কে কাটিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, অসম্ভব কোণ থেকে গোল করা, সতীর্থকে এমন পাস দেওয়া যা সাধারণ চোখে দেখা যায় না—এসবই মেসিকে কেবল একজন ফুটবলার নয়, একজন ফুটবল-শিল্পীতে পরিণত করেছে।

এবার মেসি শুধু দর্শক
মেসির নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয় দলের জার্সি আর পরবেন না তিনি; এবার থেকে তিনি তাঁর দেশের দলের একজন সমর্থক হিসেবেই থাকবেন। যে মানুষটি দুই দশক ধরে আর্জেন্টিনার আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন, যাঁর পায়ে বল থাকলে কোটি কোটি মানুষের হৃদস্পন্দন বেড়ে যেত, তিনি এবার গ্যালারিতে বসে আর্জেন্টিনার খেলা দেখবেন। এটাই ফুটবলের নির্মম বাস্তবতা।

ম্যারাডোনার পর মেসি—এবার নতুন উত্তরসূরির অপেক্ষা
আর্জেন্টিনার ফুটবল ইতিহাসে দিয়েগো ম্যারাডোনা ও লিওনেল মেসি—দুটি নাম যেন দুটি মহাকাব্য। মেসি তাঁর নিজের গল্পে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটির উত্তর দিয়ে গেছেন।

এখন আর্জেন্টিনার সামনে নতুন প্রশ্ন—মেসির পর কে?

আর্জেন্টিনার নতুন প্রজন্মের খেলোয়াড়দের সামনে এখন বিশাল দায়িত্ব। কিন্তু মেসির মতো আরেকজন মেসি আসবেন কি না, সেটি সময়ই বলবে। কারণ কিংবদন্তি তৈরি করা যায় না। কিংবদন্তি জন্ম নেয়।

শেষ কথা
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হলো। কিন্তু তাঁর গল্প শেষ হলো না। বরং এখন থেকে মেসিকে নিয়ে লেখা হবে ইতিহাসের পাতায়। আলোচনা হবে তাঁর রেকর্ড নিয়ে, তাঁর গোল নিয়ে, তাঁর ট্রফি নিয়ে, তাঁর ব্যর্থতা নিয়ে, তাঁর প্রত্যাবর্তন নিয়ে। আর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হবে সেই মানুষটির কথা—যিনি বছরের পর বছর সমালোচনা সহ্য করেও নিজের স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন এবং শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছেন।

মেসি হয়তো আর্জেন্টিনার জার্সি খুলে রাখলেন। কিন্তু আর্জেন্টিনা ও বিশ্ব ফুটবলের হৃদয় থেকে তাঁর ১০ নম্বর জার্সি কখনোই মুছে যাবে না।

কারণ কিছু খেলোয়াড় অবসর নেন।
কিছু খেলোয়াড় ইতিহাস হয়ে যান।

লিওনেল মেসি—দ্বিতীয় দলের মানুষ।

বিদায়, লিও। ফুটবল তোমাকে মনে রাখবে।

সম্পর্কিত খবর

চট্টগ্রামে এক টেবিলে ২৭ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনলেন জেলা প্রশাসক

চট্টগ্রাম : কারও শরীর প্যারালাইসিসে অবশ, কারও প্রয়োজন অস্ত্রোপচার। কেউ কিডনি রোগের চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় এক...

‘কর্ষণে বুননে সৃজনে’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে ‘বিবেক, বিশ্বাস ও মূল্যবোধে দৃঢ় কামরুল হাসান বাদলের অবস্থান স্বতন্ত্র’

‘কামরুল হাসান বাদলের সাহিত্যচর্চার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তাঁর জোরালো বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান ও সময়ের প্রতি দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্র ও সমাজের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড, অনিয়ম, অসংগতি ও অন্যায়ের...

চট্টগ্রামে হারানো অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া পর্যন্ত এসব অস্ত্র সমাজের সবার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ : র‍্যাব-৭

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রামে হারিয়ে যাওয়া সরকারি অস্ত্র উদ্ধারে সবার সহযোগিতা চেয়েছে র‌্যাব-৭ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, হারানো অস্ত্র উদ্ধার না...

হাসপাতালের লাইন দীর্ঘ না করতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে: ডিসি জাহিদ

চট্টগ্রাম : হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি...

মাদার তেরেসা অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত চট্টগ্রাম জেলা নাজির আরিফ হোসেন

চট্টগ্রাম : মাদার তেরেসা পিস অ্যাওয়ার্ড-২০২৬ পদকে ভূষিত হয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের উপসহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা (জেলা নাজির) আরিফ হোসেন। মাদার তেরেসার ১১৬তম জন্মবার্ষিকী...

সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ সময় : চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেছেন, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর ডেঙ্গুর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সময় হওয়ায় এসময়ে মশক নিধন ও জনসচেতনতা...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত