সোমবার, জুন ১, ২০২৬

শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক অবক্ষয়, সুলভ নেশা ও অবাধ ইন্টারনেটের প্রভাব : সমাজের জন্য নীরব মহামারি

শিশির পারিয়াল

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন কিংবা অনলাইনে শিশুদের হয়রানির খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ থাকলেও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাব, সহজলভ্য মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার সংকট
একসময় পরিবার ছিল শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। বাবা-মা সন্তানকে নৈতিকতা, মানবিকতা, শালীনতা ও দায়িত্ববোধ শেখাতেন। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সেই পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ কমে গেছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে, অথচ নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একটি শিশু যখন পরিবারে সহিংসতা, অশালীন আচরণ বা নারীর প্রতি অসম্মানজনক মনোভাব দেখে বড় হয়, তখন তার মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে সেই বিকৃত মানসিকতা অপরাধপ্রবণ আচরণে রূপ নিতে পারে। আবার অনেক অভিভাবক সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম বা বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কে পর্যাপ্ত নজরদারি করেন না। ফলে শিশুরা সহজেই অনৈতিক ও বিকৃত বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে চলে যায়।

সুলভ নেশা ও অপরাধপ্রবণতা
বাংলাদেশে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা বর্তমানে বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্ত অবস্থায় আটক হতে দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি মানুষের স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সহজেই বিকৃত ও সহিংস আচরণের দিকে ধাবিত হয়। শিশু ধর্ষণের বহু ঘটনায় অভিযুক্তদের মাদকাসক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নেশা শুধু অপরাধের প্রবণতাই বাড়ায় না, বরং একজন মানুষকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়।

সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বেকারত্ব, হতাশা, অসুস্থ বিনোদন ও অপরাধচক্রের বিস্তারের কারণে তরুণ সমাজের একটি অংশ নেশার দিকে ঝুঁকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর প্রভাব, যা শিশু ও নারীর নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

অবাধ ইন্টারনেট ও বিকৃত মানসিকতার বিস্তার
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, সহিংস কনটেন্ট এবং অশ্লীল ভিডিও দেখার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসময় ধরে অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্ট দেখার ফলে অনেকের মধ্যে বিকৃত যৌন মানসিকতা তৈরি হয়। বাস্তব জীবনে নারী ও শিশুকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সহজেই অশালীন কনটেন্ট পাওয়া যাওয়ায় কিশোর-তরুণদের একটি অংশ মানসিকভাবে বিপথগামী হয়ে পড়ছে।

এছাড়া অনলাইন গেম, গোপন চ্যাটিং অ্যাপ ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে শিশুদের টার্গেট করে অপরাধ সংঘটনের ঘটনাও বাড়ছে। অনেক শিশু অনলাইনে প্রতারণা ও যৌন হয়রানির শিকার হলেও পরিবারকে জানাতে ভয় পায়।

সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
শিশু ধর্ষণের শিকার একটি শিশুর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত তৈরি হয়। অনেক শিশু ভয়, হতাশা ও সামাজিক লজ্জার কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। কেউ কেউ পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়, আবার কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। পরিবারও সামাজিকভাবে অপমান ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশু ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। যখন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধ বাড়তে থাকে।

করণীয় কী
বিশেষজ্ঞরা শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—

পরিবারে ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পরিবেশ জোরদার করা।

শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করা।

ইন্টারনেট ব্যবহারে পারিবারিক নজরদারি ও ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

বিদ্যালয়ে যৌন সচেতনতা ও নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।

শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

সামাজিকভাবে ধর্ষক ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

শিশু ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সমাজের নৈতিক ও সামাজিক সংকটের ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। শুধু আইন প্রয়োগ করেই এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নৈতিক শিক্ষা, সুস্থ সংস্কৃতি, মাদকমুক্ত সমাজ ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। অন্যথায় শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ার স্বপ্ন ক্রমেই দূরে সরে যাবে।

শিশির পারিয়াল

প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল

সম্পর্কিত খবর

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বাংলাদেশের জনগণকে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয়  প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ও বাংলাদেশের জনগণকে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন বাংলাদেশের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী...

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : উত্তরাঞ্চলের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের জীবন-জীবিকা, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে তিস্তা নদী। একসময় প্রমত্তা এই নদী আজ শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং বর্ষায়...

পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে গণমাধ্যমকর্মীদের শুভেচ্ছা জানালেন এমপি সাঈদ আল নোমান

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সকল গণমাধ্যমকর্মী, সম্পাদক, সাংবাদিক এবং সংবাদপত্র শিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন সংসদ সদস্য সাঈদ...

চট্টগ্রাম স্টেডিয়াম মাঠে ঈদ-উল আযহার জামাতে বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসক

প্রতি বছরের ন্যায় এবারও জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় ও চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় ঈদ-জামাত কমিটির উদ্যোগে চট্টগ্রাম জেলা স্টেডিয়াম সংলগ্ন জিমনেসিয়াম মাঠে পবিত্র ঈদ-উল আযহার প্রধান জামাত...

রাজধানীতে ঈদের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত

রাজধানী ঢাকার হাইকোর্ট সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে পবিত্র ঈদুল আজহার প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার ২৮ মে সকাল সাড়ে ৭টা ৩০ মিনিটে প্রধান...

সামনে অত্যন্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়, হেসে খেলে সময় কাটালে অনেক বড় ক্ষতি হবে : মাননীয় প্রধানমন্ত্রী

সামনে অত্যন্ত কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় অপেক্ষা করছে বলে মন্তব্য করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারম্যান জনাব  তারেক রহমান। এই...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত