শনিবার, সেপ্টেম্বর ১৯, ২০২৬

শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে নৈতিক অবক্ষয়, সুলভ নেশা ও অবাধ ইন্টারনেটের প্রভাব : সমাজের জন্য নীরব মহামারি

শিশির পারিয়াল

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু ধর্ষণ, যৌন নিপীড়ন কিংবা অনলাইনে শিশুদের হয়রানির খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব ঘটনা শুধু একটি শিশুর জীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ধর্ষণ বৃদ্ধির পেছনে বহুমাত্রিক কারণ থাকলেও পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার অভাব, সহজলভ্য মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্য এবং অবাধ ও নিয়ন্ত্রণহীন ইন্টারনেট ব্যবহার বড় ভূমিকা রাখছে।

পারিবারিক নৈতিক শিক্ষার সংকট
একসময় পরিবার ছিল শিশুর প্রথম বিদ্যালয়। বাবা-মা সন্তানকে নৈতিকতা, মানবিকতা, শালীনতা ও দায়িত্ববোধ শেখাতেন। কিন্তু আধুনিক ব্যস্ত জীবনে সেই পারিবারিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক পরিবারে সন্তানদের সঙ্গে মানসিক যোগাযোগ কমে গেছে। শিশুরা বড় হচ্ছে মোবাইল ফোন, টেলিভিশন ও ভার্চুয়াল জগতের প্রভাবে, অথচ নৈতিক শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ শেখানোর পরিবেশ সংকুচিত হচ্ছে।

মনোবিজ্ঞানীদের মতে, একটি শিশু যখন পরিবারে সহিংসতা, অশালীন আচরণ বা নারীর প্রতি অসম্মানজনক মনোভাব দেখে বড় হয়, তখন তার মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। পরবর্তীতে সেই বিকৃত মানসিকতা অপরাধপ্রবণ আচরণে রূপ নিতে পারে। আবার অনেক অভিভাবক সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম বা বন্ধু-বান্ধব সম্পর্কে পর্যাপ্ত নজরদারি করেন না। ফলে শিশুরা সহজেই অনৈতিক ও বিকৃত বিষয়বস্তুর সংস্পর্শে চলে যায়।

সুলভ নেশা ও অপরাধপ্রবণতা
বাংলাদেশে মাদক ও নেশাজাতীয় দ্রব্যের সহজলভ্যতা বর্তমানে বড় সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক এখন শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই কিশোর ও তরুণদের মাদকাসক্ত অবস্থায় আটক হতে দেখা যায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্তি মানুষের স্বাভাবিক বিবেচনাবোধ ও আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা নষ্ট করে দেয়। নেশাগ্রস্ত ব্যক্তি সহজেই বিকৃত ও সহিংস আচরণের দিকে ধাবিত হয়। শিশু ধর্ষণের বহু ঘটনায় অভিযুক্তদের মাদকাসক্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। নেশা শুধু অপরাধের প্রবণতাই বাড়ায় না, বরং একজন মানুষকে নৈতিকভাবে ধ্বংস করে দেয়।

সামাজিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বেকারত্ব, হতাশা, অসুস্থ বিনোদন ও অপরাধচক্রের বিস্তারের কারণে তরুণ সমাজের একটি অংশ নেশার দিকে ঝুঁকছে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে অপরাধপ্রবণ গোষ্ঠীর প্রভাব, যা শিশু ও নারীর নিরাপত্তাকে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।

অবাধ ইন্টারনেট ও বিকৃত মানসিকতার বিস্তার
বর্তমান সময়ে ইন্টারনেট মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। তবে এর ইতিবাচক ব্যবহারের পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও ভয়াবহভাবে বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু-কিশোর ও তরুণদের মধ্যে পর্নোগ্রাফি, সহিংস কনটেন্ট এবং অশ্লীল ভিডিও দেখার প্রবণতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘসময় ধরে অশ্লীল ও সহিংস কনটেন্ট দেখার ফলে অনেকের মধ্যে বিকৃত যৌন মানসিকতা তৈরি হয়। বাস্তব জীবনে নারী ও শিশুকে ভোগের বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতা বাড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে সহজেই অশালীন কনটেন্ট পাওয়া যাওয়ায় কিশোর-তরুণদের একটি অংশ মানসিকভাবে বিপথগামী হয়ে পড়ছে।

এছাড়া অনলাইন গেম, গোপন চ্যাটিং অ্যাপ ও ভুয়া পরিচয়ের মাধ্যমে শিশুদের টার্গেট করে অপরাধ সংঘটনের ঘটনাও বাড়ছে। অনেক শিশু অনলাইনে প্রতারণা ও যৌন হয়রানির শিকার হলেও পরিবারকে জানাতে ভয় পায়।

সামাজিক ও মানসিক প্রভাব
শিশু ধর্ষণের শিকার একটি শিশুর জীবনে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক ক্ষত তৈরি হয়। অনেক শিশু ভয়, হতাশা ও সামাজিক লজ্জার কারণে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে না। কেউ কেউ পড়াশোনা বন্ধ করে দেয়, আবার কেউ আত্মহত্যার পথও বেছে নেয়। পরিবারও সামাজিকভাবে অপমান ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে পড়ে।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, শিশু ধর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতিফলন। যখন পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো মানবিক মূল্যবোধ তৈরিতে ব্যর্থ হয়, তখন অপরাধ বাড়তে থাকে।

করণীয় কী
বিশেষজ্ঞরা শিশু ধর্ষণ প্রতিরোধে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—

পরিবারে ধর্মীয়, নৈতিক ও মানবিক শিক্ষার পরিবেশ জোরদার করা।

শিশুদের সঙ্গে অভিভাবকদের খোলামেলা সম্পর্ক তৈরি করা।

ইন্টারনেট ব্যবহারে পারিবারিক নজরদারি ও ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি করা।

মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন প্রয়োগ ও সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

বিদ্যালয়ে যৌন সচেতনতা ও নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা।

শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা।

সামাজিকভাবে ধর্ষক ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা।

শিশু ধর্ষণ কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি সমাজের নৈতিক ও সামাজিক সংকটের ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ। শুধু আইন প্রয়োগ করেই এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ, রাষ্ট্র ও গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। নৈতিক শিক্ষা, সুস্থ সংস্কৃতি, মাদকমুক্ত সমাজ ও দায়িত্বশীল ইন্টারনেট ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিরাপদ রাখা সম্ভব। অন্যথায় শিশুদের জন্য নিরাপদ সমাজ গড়ার স্বপ্ন ক্রমেই দূরে সরে যাবে।

শিশির পারিয়াল

প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল

সম্পর্কিত খবর

বিজিসি ট্রাস্টের দিনব্যাপী সিজেন রিজিওনাল ক্লাস্টার মিটিং অনুষ্ঠান সম্পন্ন

চট্টগ্রাম : সাংবাদিকতা শিক্ষা ও গবেষণাকে এগিয়ে নেওয়া এবং সিজেন-এর কার্যক্রম সম্প্রসারণ লক্ষ্যে বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এর জার্নালিজম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের উদ্যোগে...

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী কে দুটি আমন্ত্রণ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের জন্য দু’টি পৃথক আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে জানিয়েছে প্রতিবেশী ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এর একটি ছিল দ্বিপক্ষীয় সফরের জন্য,...

চট্টগ্রামে এক টেবিলে ২৭ মানুষের সুখ-দুঃখের কথা শুনলেন জেলা প্রশাসক

চট্টগ্রাম : কারও শরীর প্যারালাইসিসে অবশ, কারও প্রয়োজন অস্ত্রোপচার। কেউ কিডনি রোগের চিকিৎসা চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। আবার অর্থের অভাবে মেয়ের বিয়ে নিয়ে দুশ্চিন্তায় এক...

দুই-তিন দিন ধরে জ্বর থাকলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত : চসিক মেয়র

চট্টগ্রাম : ডেঙ্গু প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। তিনি বলেন, শুধু মশক নিধন কার্যক্রম...

ঢাবিতে সাধারণ ছাত্রদের প্রতিবাদ : জিন্নাহ ও গোলাম আযমের ছবি পদদলিত

ছবি : সংগৃহীত   ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের সাবেক গভর্নর জেনারেল মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদে ব্যতিক্রমী কর্মসূচি পালন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের...

হাসপাতালের লাইন দীর্ঘ না করতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে: ডিসি জাহিদ

চট্টগ্রাম : হাসপাতালে রোগীর চাপ কমাতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করে রোগ প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা। তিনি...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত