প্রতি কয়েক বছর পরপর প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে জন্ম নেয় একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত ঘটনা, যার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর প্রায় সব মহাদেশে। এই ঘটনাটির নাম এল নিনো (El Niño)। দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলীয় জেলেরা শত শত বছর আগে বড়দিনের সময় সমুদ্রের অস্বাভাবিক উষ্ণতা লক্ষ্য করে এর নাম দিয়েছিল “এল নিনো”, যার অর্থ স্প্যানিশ ভাষায় “শিশুপুত্র” বা “খ্রিস্টশিশু”। বর্তমানে এটি বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জলবায়ুগত ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হয়।
এল নিনো কী?
এল নিনো হলো এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন (ENSO) নামক বৈশ্বিক জলবায়ু ব্যবস্থার উষ্ণ পর্যায়। এ সময় মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। এর ফলে বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রার স্বাভাবিক ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে, যা বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও কৃষিকে প্রভাবিত করে।
এল নিনো কেন সৃষ্টি হয়?
স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরে পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে প্রবাহিত ট্রেড উইন্ড বা বাণিজ্যিক বায়ু উষ্ণ পানিকে ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে গভীর সমুদ্রের ঠান্ডা পানি উপরে উঠে আসে।
কিন্তু কোনো কারণে যখন এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়ে বা বিপরীতমুখী হয়, তখন উষ্ণ পানি পূর্ব দিকে ফিরে আসে এবং মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হতে থাকে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যায় এবং এল নিনো পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এই পরিবর্তন বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও বৃষ্টিপাতের ধরণকেও পাল্টে দেয়।
এল নিনোর ক্ষতিকারক প্রভাব
এল নিনো সরাসরি কোনো একটি দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক জলবায়ু ঘটনা। এর প্রধান ক্ষতিকর প্রভাবগুলো হলো—
১. খরা ও পানির সংকট
এল নিনোর সময় অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যায়। ফলে খরা, বন অগ্নিকাণ্ড এবং পানির সংকট দেখা দেয়।
২. অতিবৃষ্টি ও বন্যা
দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূল, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল এবং আফ্রিকার কিছু এলাকায় অতিবৃষ্টি ও ভয়াবহ বন্যা দেখা দিতে পারে।
৩. তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি
এল নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। ফলে তীব্র তাপপ্রবাহ, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়।
৪. কৃষি উৎপাদনে ক্ষতি
বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, খরা ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যেতে পারে। এর ফলে খাদ্যমূল্যও বৃদ্ধি পায়।
৫. সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি
সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাছের প্রজনন ও খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হয়। দক্ষিণ আমেরিকার মৎস্যশিল্প প্রায়ই বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়ে।
কোন কোন দেশ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
ইতিহাসে বহু দেশ এল নিনোর কারণে বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে।
পেরু ও ইকুয়েডর : অতিবৃষ্টি, ভূমিধস ও বন্যা।
অস্ট্রেলিয়া : দীর্ঘস্থায়ী খরা, তাপপ্রবাহ ও দাবানল।
ইন্দোনেশিয়া : বন অগ্নিকাণ্ড ও বৃষ্টিপাতের ঘাটতি।
ভারত : দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি ও কৃষি উৎপাদন হ্রাস।
ফিলিপাইন : পানির সংকট ও কৃষিক্ষতি।
আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে পূর্ব আফ্রিকার অঞ্চলগুলোতে কখনও বন্যা আবার কখনও খরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরে যে এল নিনো গড়ে উঠছে
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (World Meteorological Organization) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জলবায়ু সংস্থার সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালের মাঝামাঝি থেকে একটি নতুন এল নিনো গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ৮০ শতাংশেরও বেশি এবং বছরের শেষ পর্যন্ত এটি অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা ৯০ শতাংশের কাছাকাছি। অনেক মডেল এটিকে মাঝারি থেকে শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে দেখছে।
বাংলাদেশের উপর সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশ সরাসরি প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে না থাকলেও এল নিনোর প্রভাব থেকে মুক্ত নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে নতুন করে সৃষ্টি হতে যাওয়া এল নিনোটির নিম্নোক্ত সম্ভাব্য প্রভাবগুলো হতে পারে—
১. দুর্বল মৌসুমি বৃষ্টি
এল নিনো সাধারণত দক্ষিণ এশিয়ার মৌসুমি বায়ুকে দুর্বল করে। ফলে বাংলাদেশে স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টিপাত হতে পারে।
২. তাপমাত্রা বৃদ্ধি
গ্রীষ্মকালে তাপপ্রবাহের মাত্রা ও স্থায়িত্ব বাড়তে পারে। দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে উচ্চ তাপমাত্রা কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করতে পারে।
৩. কৃষিখাতে চাপ
আমন ধানসহ বর্ষানির্ভর ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়বে এবং কৃষি উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেতে পারে।
৪. পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় চাপ
নদ-নদীর প্রবাহ কমে গেলে সেচ, নৌপরিবহন এবং মিঠাপানির সরবরাহে প্রভাব পড়তে পারে।
৫. খাদ্যদ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি
দেশীয় উৎপাদন কমে গেলে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যশস্যের দাম বাড়লে বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ওপরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
করণীয়
বাংলাদেশের জন্য এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি। কৃষিতে খরাসহিষ্ণু জাতের ব্যবহার, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, পানি সংরক্ষণ, আবহাওয়া পূর্বাভাস ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি জোরদার করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য।
এল নিনো প্রকৃতির একটি স্বাভাবিক ঘটনা হলেও এর প্রভাব মোটেই সাধারণ নয়। বিশ্বের বহু দেশের মতো বাংলাদেশও এর সম্ভাব্য প্রভাবের বাইরে নয়। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী ২০২৬ সালে একটি নতুন ও সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনো গড়ে উঠতে পারে। তাই সময়োপযোগী পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে কৃষি, পানি ও খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি মোকাবিলা করাই হবে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। বর্তমান সরকারের উচিত এটিকে একটি সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় সমস্যা ধরে নিয়ে সেটিকে মোকাবিলা করার জন্য এখন থেকেই প্রয়োজনীয় সচেতনতামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
শিশির পারিয়াল
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল।
