চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় : আমাদের নাবিক, পণ্যবাহী জাহাজ, ট্রলারের জন্য এ প্রজেক্ট এর মাধ্যমে পাওয়া তথ্যগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা বর্তমানে পরিবেশের সম্ভাব্য আবহাওয়া, মাছের অবস্থান সম্পর্কে জানতে পারবে। আমাদের দেশে অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমাদের সরকার যখন যাত্রা শুরু করেছিলাম তখন আমাদের ৩০ লাখ কোটি টাকা লোনের বোঝাও ছিল। এ প্রকল্পে সীমাবদ্ধ থাকলেও যে উদ্দেশ্যের জন্য এটি স্থাপন করা আছে আমরা সে উদ্দেশ্য পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাব। প্রয়োজনে নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হবে। মঙ্গলবার (৯ জুন) সকালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (চবি) মেরিন সায়েন্স ইনস্টিটিউটের পাশে স্থাপিত ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে ভূমি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন এসব কথা বলেন।
এসময় দেশের প্রথম ও একমাত্র ‘চায়না-বাংলাদেশ ওশান স্যাটেলাইট গ্রাউন্ড স্টেশন’, যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘স্যাটেলাইট ওশান অবজারভেশন অ্যান্ড ডাটা ইনোভেশন সেন্টার’। বঙ্গোপসাগর কেন্দ্রিক গবেষণা, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ পূর্বাভাস এবং নীল অর্থনীতি বাস্তবায়নে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চবি উপাচার্য বলেন, আজ এক ঐতিহাসিক দিন।বাংলাদেশের প্রথমবার মতো এমন একটি প্রকল্প চালু হয়েছে। শুধু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নয় বাংলাদেশের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় যেসব শিক্ষার্থীরা গবেষণা করতে চায় এটি তাদের অনেক সাহায্য করবে। যারা ফিশিং এর সাথে জড়িত তারা কোথায় ঘনত্ব বেশি কোথায় গেলে মাছ বেশি পাওয়া যাবে এ বিষয়ে একটি ধারণা নিতে পারবে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের যদি দক্ষ করতে হয় এটি অন্যতম একটি প্রকল্প।বিশেষজ্ঞরা জানান, বঙ্গোপসাগর নিয়ে উচ্চমানের গবেষণা জন্য দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে নিজস্ব রিয়েল-টাইম স্যাটেলাইট ডাটা সংগ্রহের সক্ষমতার অভাব ছিল। বিদেশি উৎস থেকে ডাটা সংগ্রহে বিলম্ব, সীমিত প্রবেশাধিকার ও কম রেজোলিউশনের সমস্যার কারণে গবেষণা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হতো। এসব সীমাবদ্ধতা দূর করতেই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও চীনের সেকেন্ড ইনস্টিটিউট অব ওশানোগ্রাফি (এসআইও)-এর যৌথ উদ্যোগে এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০১৯ সালে দুই প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আলোচনা শুরু হয় এবং ২০২০ সালে আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন পর্যায়ের সফর ও কারিগরি আলোচনার মাধ্যমে ২০২৪ সালে চবিতে স্টেশন স্থাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২০২৫ সালের ২৬ মার্চ অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং বর্তমানে ডাটা সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় সফটওয়্যার ও অ্যালগরিদম উন্নয়নের কাজ প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এটি একটি এক্স ও এল-ব্যান্ড স্যাটেলাইট ডাটা রিসেপশন সিস্টেম, যা বঙ্গোপসাগরের ওপর দিয়ে অতিক্রমকারী বিভিন্ন সমুদ্র ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইট থেকে সরাসরি তথ্য সংগ্রহ করতে সক্ষম। এ স্টেশনের মাধ্যমে চীনের সাতটি স্যাটেলাইট ছাড়াও যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও জাপানের বিভিন্ন আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইটের ডাটা গ্রহণ করা যাবে। স্টেশনটির প্রধান লক্ষ্য হলো স্যাটেলাইট ও রিমোট সেন্সিংভিত্তিক সমুদ্র গবেষণায় দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং গবেষণালব্ধ তথ্য ব্যবহার করে দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখা। প্রায় ১১টি স্যাটেলাইটের সঙ্গে এই গ্রাউন্ড স্টেশনের সংযোগ স্থাপন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে আবহাওয়া পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস, বন উজাড়, নদীভাঙনসহ বিভিন্ন তথ্য দ্রুত পাওয়া যাবে।
মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে স্টেশনটি মাছের সম্ভাব্য অবস্থান নির্ধারণে সহায়ক তথ্য সরবরাহ করবে। ক্লোরোফিল-এ ঘনত্ব ও সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার রিয়েল-টাইম মানচিত্র তৈরির মাধ্যমে টেকসই মাছ ধরা ও খাদ্য নিরাপত্তা জোরদারে সহায়তা করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া ঘূর্ণিঝড় ও উপকূলীয় দুর্যোগের পূর্বাভাস আরও নির্ভুল করতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা, স্রোতের গতিপথ এবং বায়ুমণ্ডলীয় তথ্য বিশ্লেষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। একই সঙ্গে সামুদ্রিক খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান, অফশোর গ্যাসক্ষেত্র পর্যবেক্ষণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা ও সামুদ্রিক পর্যটন খাতেও এ ডাটা ব্যবহার করা যাবে। প্রতিষ্ঠানটি অ্যান্টেনা, আর্কাইভ সেন্টার, কম্পিউটার, মনিটর ও গবেষণা যন্ত্রপাতিসহ প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জায়গা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ সরবরাহ, পরিচালন ব্যয় এবং দক্ষ শিক্ষক সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সহযোগিতা দিচ্ছে, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ২০ কোটি টাকা। এসময় আরও উপস্থিত ছিলেন, অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মামুন আহমেদ, চবি উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আল ফোরকানসহ অন্যান্য অতিথিরা।
