কলকাতা, ভারত : কিছুদিন পূর্বেই অনুষ্ঠিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে ধরাশায়ী তৃণমূল কংগ্রেসের নেতৃত্বের রাশ কার হাতে থাকবে, তা নিয়ে লড়াই এবার চরম আকার ধারণ করেছে। সরাসরি দলের প্রতিষ্ঠাতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে ‘আসল’ তৃণমূল কংগ্রেসের সমান্তরাল কাঠামো ঘোষণা করল ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিদ্রোহী শিবির। সোমবার বৈঠকের পর প্রবীণ বিধায়ক অরূপ রায়কে দলের চেয়ারপার্সন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে সাসপেন্ড করার কথাও ঘোষণা করেছে এই বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠী।
বিধানসভা নির্বাচনে পরাজয়ের পর তৃণমূলের ভিতরে যে ব্যাপক ভাঙন ও বিদ্রোহের সৃষ্টি হয়েছে, রোববারের এই পদক্ষেপ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একচ্ছত্র আধিপত্যের প্রতি এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছে ভারতের সচেতন রাজনৈতিক মহল।
বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়করা সোমবার কলকাতার নিউ টাউনের একটি পাঁচতারা হোটেলে দলের কাউন্সিলরদের সঙ্গে এক বিশেষ বৈঠক করেন। ওই হাই-প্রোফাইল বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অরূপ রায়, ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, জাভেদ খান, সন্দীপন সাহা, অসীম বসু, জুঁই বিশ্বাস এবং তারক সিংয়ের মতো শীর্ষ নেতারা। এছাড়া কলকাতা, হাওড়া, মুর্শিদাবাদ-সহ একাধিক জেলার বিদ্রোহী বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং প্রাক্তন জনপ্রতিনিধিরাও এই বৈঠকে অংশ নেন।
বৈঠকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, দলের অভ্যন্তরে একটি ‘সাংবিধানিক সংকট’ তৈরি হয়েছে। তাঁর যুক্তি, দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী প্রতি তিন বছর অন্তর জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি পুনর্গঠন করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে গঠিত আগের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তা পুনর্গঠন করা হয়নি। মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার কারণেই গঠনতন্ত্র মেনে দলের জাতীয় নেতৃত্ব পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করা প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। বৈঠকে সর্বসম্মতিক্রমে একটি নতুন ৩০ সদস্যের জাতীয় ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয় এবং স্বাধীন অডিটর দিয়ে দলের আর্থিক রেকর্ড পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। নয়া কমিটির মূল পদাধিকারীরা হলেন-
চেয়ারপার্সন- অরূপ রায় (হাওড়া সেন্ট্রালের প্রবীণ বিধায়ক) ভাইস-চেয়ারপার্সন ফিরহাদ হাকিম, অরূপ বিশ্বাস, রথীন ঘোষ এবং সাবিনা ইয়াসমিন৷ সাধারণ সম্পাদক- ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, জাভেদ খান এবং সন্দীপন সাহা৷ দলের কোষাধ্যক্ষ- আখরুজ্জামান আনসারি৷
বিদ্রোহী শিবিরের দাবি, এই নবগঠিত কমিটিই তৃণমূল কংগ্রেসের বৈধ উত্তরাধিকারী, কারণ বর্তমান নেতৃত্ব দলীয় গঠনতন্ত্র মেনে চলতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। সূত্রের খবর, প্রায় ৬০ জন বিধায়ক এবং কলকাতা পুরসভা-সহ বিভিন্ন এলাকার বিপুল সংখ্যক কাউন্সিলর এই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন বা গৃহীত সিদ্ধান্তগুলিতে সমর্থন জানিয়েছেন।
এর আগেই দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত প্রার্থীকে প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী দলনেতার পদ দখল করেছিলেন ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বিধানসভায় বর্তমানে প্রায় ৬৫ জন বিধায়কের সমর্থন রয়েছে বলে দাবি বিদ্রোহী শিবিরের। পাশাপাশি, লোকসভাতেও দলের ২৮ জন সাংসদের মধ্যে অন্তত ২০ জন তৃণমূল ভেঙে ন্যাশনালিস্ট সিটিজেন্স পার্টি অফ ইন্ডিয়া (NCPI)-তে যোগ দিয়ে বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA)-কে সমর্থন জানিয়েছেন।
বিপরীতে বিদ্রোহী শিবিরের এই সমান্তরাল সংগঠনকে ‘সার্কাস’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুগামী শিবির। দলের প্রবীণ নেতা কুণাল ঘোষ এক্সে (পূর্বতন টুইটার) এই পদক্ষেপকে তীব্র কটাক্ষ করে লিখেছেন, “এটি একটি কমেডি শো। তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত এক ব্যক্তি বিশেষ অধিবেশন ডাকছেন। বিষয়টি আদালতে বিচারাধীন এবং আমরা বিশ্বাস করি সুবিচার পাব। এই ধরনের হাস্যকর আচরণকে আমরা কোনও গুরুত্ব দিই না। টিএমসি মানেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাকি সব সার্কাস।”
সংবাদ সূত্র – কলকাতা নিউজ২৪.কম
