খ্যাতিমান শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। আজ সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।

স্কুলে থাকতে বাবা কবি গোলাম মোস্তফার ক্যামেরা দিয়ে ফটোগ্রাফি করতেন। ১৯৫২ সালে নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তেন। তখন ভাষা আন্দোলনের জন্য কার্টুন এঁকে এক মাসের জন্য জেলে গিয়েছিলেন। এসব ঘটনা তাঁর মনে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর আগ্রহ তৈরি করে। বাড়ি থেকে স্কুলে প্রথম হওয়ার চাপ ছিল না। আর্ট কলেজে পড়া শেষে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের অনুরোধে মুস্তাফা মনোয়ার ১৯৬০ সালে ঢাকায় এসে চারুকলায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। ১৯৬৫ সালে ডিআইটি ভবনে পাকিস্তান টেলিভিশনের (পিটিভি) ঢাকা কেন্দ্র চালু হলো। চারুকলার চাকরি ছেড়ে মুস্তাফা মনোয়ার সেখানে যোগ দিলেন। পাকিস্তানে তখন বাংলা সংস্কৃতির যাবতীয় শ্রেষ্ঠ জিনিসকে ‘ভিন্ন সংস্কৃতি’ তকমা জুড়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল। টেলিভিশনে যোগ দেওয়ার পেছনের কারণ ছিল এটাই। বাংলা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার সুযোগটা তিনি নিতে চেয়েছিলেন।
অ্যানিমেশনের কাজেও উৎসাহ ছিল। বাংলাদেশে পাপেট শো ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে তাঁর একক অবদানই বেশি। হুগলি, বাঁকুড়া, কলকাতায় পাপেট দেখে এ ব্যাপারে আগ্রহ জন্মে। তাঁর অনবদ্য সৃষ্টি পাপেট চরিত্র ‘পারুল’। পারুলকে দেখেই ইউনিসেফের র্যাচেল কার্নেগি উৎসাহিত হন। তৈরি হয় ‘মীনা’ চরিত্রটি।
টেলিভিশনে করেছেন রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ ও শেকসপিয়ারের ‘টেমিং অব দ্য শ্রু’ অবলম্বনে মুনীর চৌধুরীর অনুবাদ করা ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ এর মতো নাটক। যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টিভির ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’র জন্য এই নাটক দুটি মনোনীত হয়েছিল। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো অনুষ্ঠানেরও রূপকার তিনি।
একসময় কলকাতার বিভিন্ন নাটকের দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর ছাত্র সন্তোষ রায়ের কাছে আলাদা করে গানও শিখতে শুরু করেছিলেন। সে সময় শিল্পী নির্মলেন্দু চৌধুরীর দলে তিন বছর গান করেছেন। পরে মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সনজীদা খাতুনের উদ্যোগে যে সাংস্কৃতিক দল গড়ে উঠেছিল, সেখানে যোগ দিয়ে বিভিন্ন স্থানে দেশাত্মবোধক গানও গেয়েছেন।

মনের বয়সটাই আসল, এমনটাই মনে করেন চিত্রশিল্পী ও নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার। তিনি বলেন, ‘বয়সটা দুই রকম। একটা অঙ্কের ব্যাপার, আরেকটা মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ব্যাপার, পৃথিবীকে ভালোবাসার ব্যাপার। সেইখানে বয়স বাড়ে না।’
স্কয়ার হাসপাতাল সূত্র প্রথম আলোকে শিল্পীর মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে।
‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে খ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন।
