বৃহস্পতিবার, জুলাই ১৬, ২০২৬

প্রযুক্তির চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ : মানুষের দক্ষতার ভবিষ্যৎ

সুদীপ দাশ

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন সময় খুব কমই এসেছে, যখন পৃথিবী এত দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে। একসময় প্রযুক্তির পরিবর্তন প্রজন্মের ব্যবধানে ঘটত। একজন মানুষ যে প্রযুক্তি শিখে কর্মজীবন শুরু করতেন, প্রায় একই প্রযুক্তি ব্যবহার করেই অবসরে যেতে পারতেন। মানবসভ্যতার ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের ইতিহাস। আগুনের আবিষ্কার থেকে চাকা, কৃষি বিপ্লব থেকে শিল্পবিপ্লব, বাষ্পীয় ইঞ্জিন থেকে বিদ্যুৎ, টেলিফোন থেকে ইন্টারনেট—প্রতিটি যুগে নতুন প্রযুক্তি মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি এবং সমাজব্যবস্থাকে আমূল পরিবর্তন করেছে। কিন্তু বর্তমান সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে অতীতের কোনো সময়ের তুলনা করা কঠিন। কারণ আগে পরিবর্তন ঘটত ধীরে, এখন তা ঘটছে অভাবনীয় গতিতে।

১৯৮০-এর দশকে টাইপরাইটার জানা ছিল একটি মূল্যবান দক্ষতা। ১৯৯০-এর দশকে কম্পিউটার শেখা ছিল বড় অর্জন। ২০০০ সালের পরে ইন্টারনেট ব্যবহারের দক্ষতা কর্মজীবনের অন্যতম শর্ত হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু আজকের পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন প্রযুক্তির পরিবর্তন বছর দিয়ে নয়, অনেক ক্ষেত্রে মাস, সপ্তাহ, এমনকি দিন দিয়েও পরিমাপ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবোটিকস, ডেটা সায়েন্স এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা, শিক্ষা এবং সামাজিক জীবনের সংজ্ঞাই বদলে দিচ্ছে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তাই সামনে চলে এসেছে—আজ যে দক্ষতা একজন মানুষকে সফল করছে, আগামী দশ বছর পরেও কি সেই একই দক্ষতা তাকে সফল রাখবে? বাস্তবতা হলো, সম্ভবত না।

বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে আগে কখনো এত দ্রুত দক্ষতার মূল্য পরিবর্তিত হয়নি। একসময় শর্টহ্যান্ড জানা, টাইপ জানা কিংবা নির্দিষ্ট যন্ত্র পরিচালনা করতে পারা ছিল চাকরির নিশ্চয়তা। কিন্তু প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেসব দক্ষতার অনেকগুলোই আজ ইতিহাসের অংশ। একইভাবে বর্তমানে যেসব দক্ষতা অত্যন্ত মূল্যবান বলে বিবেচিত হচ্ছে, তারও অনেকগুলো আগামী এক দশকের মধ্যে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হবে।
এই বাস্তবতা ভয় পাওয়ার নয়, বরং বোঝার বিষয়।
অনেক মানুষ মনে করেন, একটি ডিগ্রি, একটি চাকরি বা একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করলেই জীবনের সংগ্রাম শেষ। কিন্তু আধুনিক বিশ্বের বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। এখন আর “একবার শিখলাম, সারাজীবন চলবে” — এই ধারণা কার্যকর নয়। বর্তমান যুগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হলো নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা।
একসময় প্রযুক্তির পরিবর্তন দশক দিয়ে মাপা যেত। এখন তা বছর দিয়ে মাপা কঠিন। অনেক ক্ষেত্রে মাস, সপ্তাহ কিংবা দিনের ব্যবধানেই নতুন নতুন প্রযুক্তি পুরোনো প্রযুক্তিকে অচল করে দিচ্ছে।

এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। কয়েক বছর আগেও যা ছিল গবেষণাগারের বিষয়, আজ তা সাধারণ মানুষের হাতের মুঠোয়। একজন শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, প্রকৌশলী কিংবা চিকিৎসক—প্রায় সবাই কোনো না কোনোভাবে এআই ব্যবহার করছেন। এমনকি যেসব কাজ একসময় বিশেষজ্ঞদের একচেটিয়া ক্ষেত্র ছিল, সেসব কাজও এখন প্রযুক্তির সহায়তায় অনেক সহজ হয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু এই বাস্তবতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রযুক্তি নিয়ে নয়, মানুষকে নিয়ে।
প্রশ্ন হলো—মানুষ কি এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারবে?

আজকের পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রযুক্তির উন্নয়ন নয়; বরং মানুষের দক্ষতার স্থবিরতা। কারণ প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলাচ্ছে, কিন্তু অনেক মানুষ এখনো বিশ্বাস করে যে একটি ডিগ্রি, একটি প্রশিক্ষণ বা একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা অর্জন করলেই সারাজীবন চলা সম্ভব।
হয়তো একসময় তা সম্ভব ছিল।
কিন্তু আজ আর নয়।
একসময় টাইপরাইটার জানা ছিল বিশেষ দক্ষতা। পরে কম্পিউটার সেটিকে প্রতিস্থাপন করল। একসময় কম্পিউটার পরিচালনা জানা ছিল বড় যোগ্যতা। পরে ইন্টারনেট সেই যোগ্যতার সংজ্ঞা বদলে দিল। আজ আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্যপ্রযুক্তির নতুন মাত্রা যোগ করেছে। অর্থাৎ দক্ষতা স্থায়ী নয়; সময়ের সঙ্গে তার মূল্য ও প্রয়োজন বদলে যায়। এই বাস্তবতা শুধু প্রযুক্তিখাতে নয়, প্রায় সব পেশায় দৃশ্যমান।

ব্যাংকিং খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তি লেনদেনের ধরণ বদলে দিয়েছে। সংবাদমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পদ্ধতি পরিবর্তন করছে। উৎপাদন শিল্পে রোবট মানুষের বহু কাজ সম্পন্ন করছে। কৃষিক্ষেত্রে ড্রোন ও স্মার্ট প্রযুক্তি ব্যবহার বাড়ছে। চিকিৎসাক্ষেত্রে এআই রোগ নির্ণয়ে সহায়তা করছে। শিক্ষা খাতে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল টুল শেখার ধারণাকে নতুন রূপ দিয়েছে।

অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় কোনো ক্ষেত্রই পরিবর্তনের বাইরে নেই। এই পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে একটি নতুন ধারণা—“লাইফলং লার্নিং” বা আজীবন শেখা। আগে মানুষ জীবনের প্রথম ২০-২৫ বছর শিখত এবং পরবর্তী ৩০-৪০ বছর সেই জ্ঞান ব্যবহার করত। এখন সেই মডেল আর কার্যকর নয়। বর্তমান যুগে একজন মানুষকে পুরো কর্মজীবন জুড়ে শিখতে হবে। নতুন প্রযুক্তি, নতুন দক্ষতা, নতুন চিন্তাধারা—সবকিছু নিয়মিত আয়ত্ত করতে হবে।

কারণ ভবিষ্যতের পৃথিবীতে চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে দক্ষতার অভিযোজন ক্ষমতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিশ্বের অনেক গবেষণা বলছে, বর্তমানে যে পেশাগুলো জনপ্রিয়, তার একটি বড় অংশ আগামী দুই দশকে মৌলিকভাবে পরিবর্তিত হবে। আবার ভবিষ্যতে এমন অনেক পেশার জন্ম হবে, যেগুলোর অস্তিত্ব আজ নেই। যেমন ২০ বছর আগে “সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার”, “ডেটা সায়েন্টিস্ট” বা “এআই প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ার” নামে কোনো পরিচিত পেশা ছিল না। অথচ আজ এগুলো গুরুত্বপূর্ণ কর্মক্ষেত্র।
এই বাস্তবতা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যও বড় বার্তা বহন করে।

আমরা যদি এখনো কেবল মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা প্রতিযোগিতার জন্য প্রস্তুত করতে পারব না। আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে মূল্যবান হবে বিশ্লেষণী ক্ষমতা, সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং নতুন কিছু শেখার মানসিকতা।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো তথ্য দিতে পারবে, কিন্তু মানবিক মূল্যবোধ, সহানুভূতি, নৈতিক বিচারবোধ এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকল্প হতে পারবে না। তাই মানুষের শক্তি প্রযুক্তির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করা নয়; বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে নিজের সক্ষমতাকে আরও উন্নত করা।

বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় ভুল ধারণাগুলোর একটি হলো—“আমার বর্তমান দক্ষতাই যথেষ্ট।”
বাস্তবে এটি ভবিষ্যতের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ চিন্তা।

কারণ পরিবর্তন থেমে নেই। যে ব্যক্তি আজ একটি দক্ষতা নিয়ে সন্তুষ্ট, আগামী দশ বছর পরে তিনি হয়তো দেখবেন পৃথিবী সম্পূর্ণ ভিন্ন হয়ে গেছে। তার জানা পদ্ধতি, ব্যবহৃত প্রযুক্তি কিংবা অর্জিত অভিজ্ঞতার বড় অংশ নতুন বাস্তবতায় পর্যাপ্ত নয়।
অন্যদিকে যে ব্যক্তি প্রতিনিয়ত শিখছে, নিজেকে আপডেট করছে এবং নতুন বাস্তবতাকে গ্রহণ করছে, সে-ই ভবিষ্যতের সুযোগগুলো কাজে লাগাতে পারবে।

প্রযুক্তির ইতিহাস আমাদের একটি শিক্ষা দেয়—যন্ত্র বদলায়, সফটওয়্যার বদলায়, বাজার বদলায়, পেশা বদলায়; কিন্তু শেখার ক্ষমতা এবং অভিযোজনের মানসিকতা কখনো মূল্য হারায় না।
এই কারণেই আগামী পৃথিবীতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা কোনো নির্দিষ্ট সফটওয়্যার, ভাষা বা প্রযুক্তি নয়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে নতুন কিছু শেখার ক্ষমতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা।

সম্ভবত আগামী কয়েক দশকের সবচেয়ে বড় বিভাজন ধনী-গরিবের মধ্যে হবে না, বরং যারা শিখতে থাকবে এবং যারা শেখা বন্ধ করে দেবে—তাদের মধ্যে হবে।

ভবিষ্যতের পৃথিবীতে টিকে থাকবে সেই মানুষ, যে পরিবর্তনকে ভয় পাবে না; বরং তাকে নিজের উন্নতির সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করবে।
কারণ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে স্থায়ী চাকরি নেই, স্থায়ী প্রযুক্তি নেই, স্থায়ী বাজার নেই, এমনকি স্থায়ী দক্ষতাও নেই। স্থায়ী যদি কিছু থাকে, তা হলো পরিবর্তন।

আর সেই পরিবর্তনের পৃথিবীতে মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি হবে তার শেখার ক্ষমতা, অভিযোজনের ক্ষমতা এবং নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার সাহস।

সম্পর্কিত খবর

জুলাই শহীদ দিবস উপলক্ষে মহামান্য রাষ্ট্রপতির বাণী

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তাদের স্বপ্নের বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে দল-মত-পথ নির্বিশেষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ...

আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে : ১০ জন নিয়েও লড়াকু সুইজারল্যান্ড

সুইজারল্যান্ড ১ : ৩ আর্জেন্টিনা  ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬ এর শেষ কোয়ার্টার-ফাইনালে ক্যানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়ে আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের প্রতিপক্ষ হিসেবে নিজেদের নাম...

দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে সরকার, খাল পুনঃখননে বিশেষ গুরুত্ব : ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু

চট্টগ্রাম : দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, ভারী বর্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে সরকার রয়েছে এবং চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন ও...

স্মরণসভা : অন্ধত্ব নিবারণের ক্ষেত্রে অধ্যাপক ডা. রবিউল হোসেনের কাছে আমরা ঋনী

চট্টগ্রাম : হাসপাতাল সমাজসেবা কার্যালয়াধীন চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল রোগীকল্যাণ সমিতির উদ্যোগে উপমহাদেশের কিংবদন্তি চক্ষু চিকিৎসক, চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি)’র উপদেষ্টা ও...

সেমি ফাইনালে ফ্রান্স হয়ে গেলো শক্তিহীন : অনায়াস জয়ে ফাইনালে স্পেন

স্পেন ২ : ০ ফ্রান্স  টুর্নামেন্টে সেরা আক্রমণভাগ ছিল ফ্রান্সের। সেরা রক্ষণ স্পেনের। ডালাসে গতকাল রাতের উভয়ের লড়াইয়ে বিজয়ী হলো স্পেনের রক্ষণভাগ। হঠাৎই বিবর্ণ হয়ে...

চট্টগ্রাম তুলসীধামের রথযাত্রা তিনশ বছরের প্রাচীন, ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের জন্য সরকারের নিকট দাবি জানালো কেন্দ্রীয় কমিটি

চট্টগ্রাম : শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের রথযাত্রা উপলক্ষে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে কেন্দ্রীয় রথযাত্রা উদযাপন কমিটি। এ উপলক্ষে গতকাল নন্দনকানন তুলসীধামে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত