শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন বলেছেন, জাতিকে সুশিক্ষিত করাই আমাদের দায়িত্ব। তাই যত ট্রল বা অপবাদই আসুক না কেন, আমাদের সঠিক দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করা যাবে না। আজ শনিবার ১৮ জুলাই দুপুরে নওগাঁ সদর উপজেলা পরিষদ অডিটোরিয়ামে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন ও নবাগত শিক্ষার্থীদের বরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো জনশক্তি। এই সম্পদকে দক্ষ মানবসম্পদে পরিণত করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বাড়াতে হবে এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন করতে হবে।’
এর আগে শহরের বরুনকান্দি এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থায়ী ক্যাম্পাসে নামফলক উন্মোচন এবং পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন শিক্ষামন্ত্রী। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলী স্বাগত বক্তব্য দেন।
সম্প্রতি এইচএসসি পরীক্ষা নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে হওয়া আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘সিটি কলেজের এক শিক্ষার্থী বারবার আমার সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। আমি কথা বলি। সে পরীক্ষা পেছানোর অনুরোধ জানায়। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা ইচ্ছামতো পরিবর্তন করা যায় না। আবহাওয়া অধিদপ্তরের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছিলাম, ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। তাই পরীক্ষা যথাসময়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। পরে দেখা গেল দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা বৃষ্টি হয়েছে। তবে কেবল কুমিল্লা মহিলা কলেজ কেন্দ্রেই জলাবদ্ধতার কারণে সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট এলাকার ইউএনও ও জেলা প্রশাসক পরীক্ষা স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। বিষয়টি জানার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘বৃষ্টি হলে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া নতুন কোনো বিষয় নয়। এ অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতে পরীক্ষার সময়সূচি আরও উপযোগী করার চেষ্টা করছি।’
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথোপকথনের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ‘আমি শিক্ষার্থীদের কষ্টের বিষয়টি উপলব্ধি করেছি এবং তাদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছি। কিন্তু বিষয়টিকে ঘিরে একটি নেতিবাচক বর্ণনা তৈরি করা হয়েছে। যারা আমাকে নিয়ে ট্রল করেছে, তাদের অনেকেই পরীক্ষার্থী ছিল না। অথচ ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে নামতে দেখা যায়নি। একটি মহল বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।’
অবিচলভাবে দায়িত্ব পালন করে যাবেন জানিয়ে জনাব এহছানুল হক মিলন বলেন, ‘যত ট্রল ও অপবাদই দেওয়া হোক না কেন, আমাদের দায়িত্ব পালন থেকে কেউ বিচ্যুত করতে পারবে না।’
নিজের রাজনৈতিক জীবনের প্রসঙ্গ টেনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত দেশমাতা বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। বর্তমানে তারেক রহমানের নেতৃত্বে দায়িত্ব পালন করছি। তাই অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার প্রশ্নই আসে না।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘তখন মালয়েশিয়ার শিক্ষার্থীরাও সেখানে পড়তেন। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক হল নির্মাণ করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ছাত্রদলের প্রথম কমিটিতেও আমি ছিলাম।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারেক রহমান দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনে থেকেও বাংলাদেশের উন্নয়ন নিয়ে চিন্তা করেছেন। তার ভাবনায় শিক্ষা ছিল সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। সে কারণেই শিক্ষা খাতে ১ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট দেওয়া হয়েছে।’ সবাইকে দেশ গঠনে সরকারের পাশে থাকার আহ্বান জানান তিনি। বাংলাদেশকে শিক্ষার হাব হিসেবে গড়ে তুলতে চান জানিয়ে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশকে বিশ্বের একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাই, যেখানে বিদেশি শিক্ষার্থীরাও পড়তে আসবে। বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা বিদেশে মেধার স্বাক্ষর রাখছে। তাহলে আমরা নিজের দেশকেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারব।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ হাছানাত আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ, ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল।
এ ছাড়া বক্তব্য দেন নওগাঁ-৬ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মোহাম্মদ রেজাউল ইসলাম রেজু, নওগাঁ-৫ আসনের সংসদ সদস্য জাহিদুল ইসলাম ধলু, নওগাঁ-৪ আসনের সংসদ সদস্য ডা. একরামুল বারী টিপু, নওগাঁ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হুদা বাবুল, নওগাঁ-২ আসনের সংসদ সদস্য মো. এনামুল হক, জেলা পরিষদের প্রশাসক আবু বক্কর সিদ্দিক নান্নু, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদুল ইসলাম এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ এস এম আমানুল্লাহ। অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন এবং এনসিপির কেন্দ্রীয় নেত্রী মনিরা শারমিনসহ অনেকে উপস্থিত ছিলেন।
শুভেচ্ছা বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্বোধন জেলার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।’ তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু সরকারি চাকরির দিকে না ঝুঁকে দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, ‘আন্দোলনের নামে নকলের সুযোগ বা অটোপাসের দাবি গ্রহণযোগ্য নয়। শিক্ষামন্ত্রী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেছেন, সেটিই গণতান্ত্রিক চর্চার উদাহরণ। যে শিক্ষা ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে আসে না, সেই শিক্ষা নিয়ে অযৌক্তিক দাবি তোলা উচিত নয়।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষা খাতে সর্বোচ্চ বরাদ্দ দিয়ে সরকার মানবসম্পদ উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছে।’
উল্লেখ্য, ২০২২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি নওগাঁয় বঙ্গবন্ধুর নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইনের খসড়া অনুমোদন দেয় তৎকালীন মন্ত্রিসভা। ২০২৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সংসদে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিশ্ববিদ্যালয়, নওগাঁ আইন পাস হয়। পরে ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয় রাখে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে হিসাববিজ্ঞান ও আইন বিভাগে ৪০ জন করে মোট ৮০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করল নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।
