সাহাদাত পারভেজ
পথিকৃৎ আলোকচিত্রশিল্পী মৃণাল সরকারের প্রয়াণ দিবসে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই দেশ রূপান্তর এ প্রকাশিত প্রবন্ধটির শিরোনাম ছিল ‘মৃণাল সরকার : আলোর ফেরিওয়ালা’। ওই সময় এই মাস্টার ফটোগ্রাফারের ছবি দেখার জন্য নানা জায়গায় যোগাযোগ করি। কিন্তু কোথাও ছবি খুঁজে পাইনি। তার ছবি দেখতে না পাওয়ার দুঃখ বুকে বয়েছি তিন বছর। বুকের সেই ভার কিছুটা লাঘব হলো আলোকচিত্রশিল্পী স্বপন সাহার সান্নিধ্যলাভের সুযোগ পেয়ে। গত মাসে বেশ কয়েকবার গিয়েছি তার হাতিরপুলের বাসায়। ফটোগ্রাফি নিয়ে তার সারা জীবনের যত সংগ্রহ, তিনি সেগুলো আমাকে দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। তার সংগ্রহ ঘাঁটতে ঘাঁটতেই হঠাৎ চোখে পড়ল আয়নার পত্র নামে ফটোগ্রাফিবিষয়ক একটি ত্রৈমাসিক পত্রিকা। এই নামে যে পত্রিকা বের হতো-এ কথা আমার জানাই ছিল না। পত্রিকাটির সম্পাদক প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন।
পত্রিকাটির প্রথম সংখ্যা [এপ্রিল ১৯৮৯] হাতে নিতেই শরীরের ভেতর বিদ্যুতের মতো এক শিহরণ বয়ে গেল। বাংলাদেশের বরেণ্য সব আলোকচিত্রীর লেখা ও ছবিতে ভরপুর সংখ্যাটা। পত্রিকাটির পৃষ্ঠা ওল্টাতে ওল্টাতে শেষ প্রচ্ছদের আগের পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়া একটি সাদাকালো ছবিতে আমার চোখ আটকে যায়। একটি প্রাচীন স্থাপত্যের বিশাল জ্যামিতিক কাঠামোর মধ্যে একজন মানুষের স্থিরদৃষ্টি। তার উপরে স্থাপত্যের ত্রিভুজাকার অংশের চূড়ায় লাফ দেওয়ার অপেক্ষায় থাকা একটি বানর-এই দুইয়ের নীরব সংযোগ যেন একটি পরাবাস্তব মুহূর্তের জন্ম দিয়েছে। মহাকালের সাক্ষী এই স্থাপত্যের সুবিশাল পটভূমিতে সাধারণ প্রাণের এই ক্ষণিক ফ্রেমটি যেন আলোছায়া ও জ্যামিতির এক অপূর্ব শৈল্পিক রূপ। ছবিটির মূল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর নিখুঁত নির্ধারক মুহূর্তের মধ্যে, যাকে ফটোগ্রাফির ভাষায় বলা হয় ‘ডিসাইসিভ মোমেন্ট’। ছবিটিতে কোনো ক্যাপশন নেই। ফটো ক্রেডিটে শুধু লেখা-‘মৃণাল সরকার [ক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফার্স]। আয়নার পত্রে মৃণাল সরকারের ছবি দেখতে পেয়ে আনন্দে আমার চোখ নোনা হয়ে আসে।
পাঠশালা-সাউথ এশিয়ান মিডিয়া একাডেমির শিক্ষক ও আন্তর্জাতিক ছবি মেলার কো-কিউরেটর সরকার প্রতীকের ফেসবুক মেসেঞ্জারে ছবিটি পাঠিয়ে এর ফর্ম, কম্পোজিশন ও শিল্পমান সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাই। ওয়ার্ল্ডপ্রেস ফটো পুরস্কারজয়ী আলোকচিত্রশিল্পী সরকার প্রতীক এই ছবি সম্পর্কে লিখে পাঠান-‘মৃণাল সরকারের এই আলোকচিত্রটি অসাধারণ তীক্ষ্ণ। বাংলাদেশের প্রথম দিকের আলোকচিত্রীদের কাজের কথা ভাবলে এমন নিখুঁত গঠন কিছুটা বিস্ময় জাগায়। এই ছবিতে স্থাপত্যই সবচেয়ে শক্তিশালী দৃশ্যমান উপাদান। ছবির প্রধান তিনটি উপাদান-মানুষ, প্রাণী এবং স্থাপত্য-খোলা আকাশের সামনে আলাদা করে ফুটে উঠেছে। আর আকাশটি যেন একটি সরল পটভূমির মতো কাজ করেছে, যার ফলে প্রতিটি উপাদান স্পষ্টভাবে দেখা যায় এবং তাদের নিজস্ব উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। এই ছবি আমাকে নিউ টোপোগ্রাফিকস আন্দোলনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোকচিত্রী লুইস বাল্টজের কাজের কথা মনে করিয়ে দেয়। লুইসের ছবিতে প্রায়ই স্থাপত্য, স্থান এবং মানুষের উপস্থিতির সম্পর্ককে খুব সচেতনভাবে তুলে ধরা হয়েছে। একই সঙ্গে ছবিটি আর্নল্ড নিউম্যানের পরিবেশভিত্তিক প্রতিকৃতির কথাও মনে করায়। তার ছবিগুলোতে স্থাপত্য, খালি জায়গার ব্যবহার এবং মানুষের অবস্থান এমনভাবে সাজানো থাকে, যা ছবিকে একই সঙ্গে দৃষ্টিনন্দন এবং অর্থবহ করে তোলে। ইন্টারনেটের আগের সময়ে মৃণাল সরকারের পক্ষে বাল্টজ আর নিউম্যানের কাজ দেখার সুযোগ ছিল-এমনটা ভাবা কঠিন। তাই তাদের কাজের সরাসরি প্রভাব ছিল, এমন কথা বলারও সুযোগ নেই। বরং যেটি সবচেয়ে বিস্ময়কর, তা হলো-এই ছবিতে তার দেখার ভঙ্গি ছিল স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক। ছবিটি প্রমাণ করে যে তিনি রূপ, জ্যামিতি এবং ছবির ভেতরের সম্পর্কগুলো খুব গভীরভাবে বুঝতেন। মনে হয়, তিনি আলোকচিত্রকে শুধু ঘটনা নথিবদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং এমন একটি শিল্পমাধ্যম হিসেবে দেখেছেন, যেখানে ছবির বিন্যাস বা কম্পোজিশনের মধ্য দিয়েই অর্থ তৈরি হয়।’
আয়নার পত্রে প্রকাশিত ছবিটি কবে, কোথায় তোলা কিংবা ছবির ভেতরের মানুষটি কে-তার কোনো উল্লেখ নেই। ফলে ছবিটির স্থান ও ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করতে চট্টগ্রামের আলোকচিত্রী কমল দাশের হোয়াটসঅ্যাপ মেসেঞ্জারে ছবিটি পাঠাই। তিনি ছবিটিকে মৃণাল সরকারের কয়েকজন ছাত্র ও ঘনিষ্ঠজনকে পাঠান। কিন্তু কেউই ছবিটি সম্পর্কে কিছু বলতে পারেন না। পরে ছবিটিকে এআইতে রূপান্তর করে গুগল লেন্সে ফেলি। গুগল লেন্সের তথ্যমতে, ছবিটি ভারতের রাজস্থানের জয়পুরের যন্তর মন্তর মানমন্দিরের। এই মানমন্দির মহাজাগতিক নিখুঁততার এক অপূর্ব নিদর্শন বলে গুগল লেন্স তথ্য দেয়। ১৯৮৯ সালে ইন্ডিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফিক কাউন্সিলের [আইআইপিসি] কনফারেন্সে যোগ দিতে জয়পুরে গিয়েছিলেন মৃণাল সরকার। আলোকচিত্রের ১৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ওই কনফারেন্সে তিনি ‘ফটোজার্নালিজম ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রবন্ধ পাঠ করেন। ধারণা করি, আইআইপিপির কনফারেন্সে যোগ দিতে গিয়েই তিনি এই ছবিটা তুলেছিলেন।
পথিকৃৎ আলোকচিত্রশিল্পী হয়েও মৃণাল সরকার এই প্রজন্মের কাছে অনেকটাই বিস্মৃত। তাই তার সামান্য পরিচয় তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক মনে করি। জীবনভর ফটোগ্রাফির সেবায় নিযুক্ত ছিলেন মৃণাল সরকার। ফলে বাংলাদেশের আলোকচিত্রের ইতিহাস পাঠ করতে গেলে তাকে আমলে নিতে হয়। তার জন্ম ১৯২৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রংপুরের নবাবগঞ্জের কেরানীপাড়ায়। ১৯৪৫ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে [গভর্নমেন্ট স্কুল অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফট] ভর্তি হয়ে কিংবদন্তি চিত্রসাংবাদিক সুনীল জানাকে শিক্ষক হিসেবে পান। সুনীল জানার ক্লাসগুলো তাকে ফটোগ্রাফির প্রতি দারুণভাবে আকৃষ্ট করে তোলে। ১৯৪৮ সালে আর্ট স্কুল থেকে ব্যাচেলর ডিগ্রি করার পর কলকাতায় আঁকাআঁকি, ছবি তোলা আর আবৃত্তি নিয়ে মেতে ছিলেন। কিন্তু দুবছর পর বাবার অকালপ্রয়াণে সংসারের হাল তার ঘাড়ে এসে চাপে। খুলনায় ফিরে তিনি চাকরি নেন ‘ফোকাস’ নামের একটি স্টুডিওতে। মায়ের মৃত্যুর পর ১৯৫৮ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের মুখ্য আলোকচিত্রী হিসেবে। সেই থেকে চট্টগ্রামে তার স্থায়ী বসবাস।
পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে তিনি চট্টগ্রাম আর্ট কলেজে সান্ধ্যকালীন আলোকচিত্র প্রশিক্ষণ চালু করেন। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চট্টগ্রাম ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (সিপিএস)। ১৯৮৬ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফার’। পরের বছর বাংলাদেশ আলোকচিত্র ফেডারেশন। ক্রিয়েটিভ ফটোগ্রাফার্সের ব্যানারে ১৯৮৮ সালে তিনি এ দেশে প্রথম আন্তর্জাতিক স্যালনের আয়োজন করেন। ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আলোকচিত্রম’ নামে একটি আলোকচিত্র শিক্ষা কেন্দ্র। ১৯৫৪ সালে তিনি পাকিস্তান ফটোগ্রাফিক সোসাইটির সদস্য হন। ১৯৮৩ সালে লাভ করেন আইআইপিসি দিল্লির সদস্যপদ। ১৯৯৪ সালে আইআইপিসির চতুর্দশ কনফারেন্সে প্রবন্ধ পাঠের মাধ্যমে বাংলাদেশের সমসাময়িক আলোকচিত্রের অবস্থান তুলে ধরেন। ১৯৯১ সালে গোয়ায় আইআইপিসি সনদ ও চণ্ডীগড়ের কনসেপ্ট ফটো ফোরামের সনদ লাভ করেন। এই সব পরিচয়ের বাইরে তিনি ছিলেন একজন গুণী চিত্রশিল্পী ও সফল আবৃত্তিকার।
মৃণাল সরকারের ছবির আর্কাইভ কোথায় জানতে সিপিএসের সাবেক সভাপতি বাসব শীলকে ফোন করি। তিনি জানালেন, মৃণাল সরকার জাতশিল্পী ছিলেন। বৈষয়িক বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল। ফটোগ্রাফির সাংগঠনিক কাজে দুই হাতে অর্থ খরচ করতেন। সংসার কী করে চলবে-সেদিকে তার খেয়াল ছিল না। বাসব শীল একটা ঘটনা বললেন। মৃত্যুর কয়েক মাস আগে তিনি মৃণাল সরকারের কাছ থেকে ফোন পেলেন। শমশেরপাড়া গিয়ে দেখেন মৃণাল সরকার বাসার বাইরে বসে আসেন। তার ছবি, নেগেটিভ-আসবাবপত্র ছড়ানো ছিটানো। দুই মাসের ভাড়া বাকি; তাই আজই তাকে বাসা ছাড়তে হবে! তিনি ভাড়া পরিশোধ করে মৃণাল সরকারকে ভারমুক্ত করলেন। বাসব শীলের কাছে এই কথা শুনে বুকের ভেতর মেঘের মতন ছায়া নামে।
মৃণাল সরকারের পরাবাস্তব মুহূর্ত
নিজস্ব প্রতিবেদক
১. রাজস্থানের জয়পুর মানমন্দিরে মৃণাল সরকারের পরাবাস্তব মুহূর্ত
২. মৃণাল সরকার [১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯২৮-১৪ জুলাই ২০০০
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
