চট্টগ্রাম, বাংলাদেশ; ২২ মে, ২০২৬ : ইউনেস্কো (UNESCO) ঢাকা অফিস, মালেয়া ফাউন্ডেশন এবং জাবারাং কল্যাণ সমিতির যৌথ উদ্যোগে আজ দ্য পেনিনসুলা চট্টগ্রামে “আদিবাসী যুবসমাজ ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক গবেষণা ফলাফল প্রকাশ অধিবেশন” সফলভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে। অর্ধদিবসব্যাপী এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যুগান্তকারী উদ্যোগ “ইউথ অ্যান্ড রিসার্চার্স (YAR): আদিবাসী যুবসমাজ ও জলবায়ু পরিবর্তন”-এর আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটল।
এই অধিবেশনে আদিবাসী যুব গবেষক, প্রথাগত নেতৃবৃন্দ, সরকারি কর্মকর্তা, উন্নয়ন সহযোগী, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং শিক্ষাবিদগণ অংশ নেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, প্রথাগত পরিবেশগত জ্ঞান এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক অভিযোজন কৌশল নিয়ে তরুণদের পরিচালিত গবেষণাকে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের জাতীয় সংলাপে তুলে ধরাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী পাঁচটি পৃথক যুব গবেষণা দল তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতাভিত্তিক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে। চাকমা গবেষণা দল “সাপছড়ি উপজেলা এবং বন্দুকভাঙার খারিক্ষ্যং-এর চাকমা আদিবাসী সম্প্রদায়” শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন, মারমা গবেষণা দল “জলবায়ু বিপর্যয় থেকে উত্তরণ- সংকটে টিকে থাকার প্রাচীন কৌশল এবং মারমা জনগোষ্ঠীর বর্তমান অভিযোজন চ্যালেঞ্জসমূহ” শীর্ষক গবেষণার ফলাফল, ম্রো গবেষণা দল “ঐতিহ্যবাহী ম্রো বাদ্যযন্ত্র ‘প্লুং’ (Plung)-এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং এর সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব” বিষয়ক গবেষণাপত্র, তঞ্চঙ্গ্যা গবেষণা দল “জলবায়ু সংকট ঘনীভূত- পাথর উত্তোলন এবং রাবার ও সেগুন বাগানের সম্প্রসারণে তঞ্চঙ্গ্যা সম্প্রদায়ের স্থানীয় পানির উৎসগুলো ঝুঁকির মুখে” শীর্ষক তাদের গবেষণা প্রতিবেদন, এবং ত্রিপুরা গবেষণা দল “প্রান্তিক ত্রিপুরা আদিবাসী নারীদের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব: চ্যালেঞ্জ এবং অভিযোজন কৌশল” বিষয়ক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করে।
মালেয়া ফাউন্ডেশনের পরিচালক জনাব মৃণাল কান্তি ত্রিপুরার স্বাগত বক্তব্য’র মধ্য দিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এরপর বাংলাদেশে ইউনেস্কোর প্রতিনিধি ও অফিস প্রধান ড. সুসান ভাইজ (Dr. Susan Vize) ‘ওয়াইএআর’ (YAR) কর্মসূচির পরিচিতি তুলে ধরে বক্তব্য দেন। বক্তব্যে ড. ভাইজ বলেন, “আদিবাসী যুবসমাজ YAR উদ্যোগের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব অভিজ্ঞতাগুলো নথিবদ্ধ করে কমিউনিটি-ভিত্তিক গবেষণা পরিচালনা করছে। প্রশাসনিক, উন্নয়ন এবং শাসন প্রক্রিয়ার অগ্রাধিকারের সাথে এই আলোচনাগুলোকে সম্পৃক্ত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অপরিহার্য।”
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার ড. মো. জিয়াউদ্দিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চাকমা সার্কেল চিফ ব্যারিস্টার রাজা দেবাশীষ রায় এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেন-এর ডিন ড. সঙ্গীতা রায়মাঝি। তাঁরা গবেষণার ফলাফলের ওপর তাঁদের সুচিন্তিত মতামত তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, “জলবায়ু পরিবর্তন কেবল প্রাকৃতিক কারণে ঘটছে না; মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণও জলবায়ুর ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন ও জীবিকা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। তাই জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত যেকোনো কাজ বা নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় তৃণমূলের মানুষকে বিবেচনায় রাখতে হবে।”
জাবারাং কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক জনাব মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার আনুষ্ঠানিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি শেষ হয় এবং পরবর্তীতে অংশগ্রহণকারীদের জন্য একটি নেটওয়ার্কিং মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।
YAR প্রকল্পটি একটি বৈশ্বিক ফ্রেমওয়ার্ক, যা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী যুবকদের ক্ষমতায়নের জন্য বাংলাদেশে স্থানীয়করণ করা হয়েছে। এই কর্মসূচি শিক্ষার্থীদের এমন সব গবেষণা পদ্ধতির শিক্ষা দেয়, যা প্রথাগত পরিবেশগত জ্ঞানকে সমসাময়িক জলবায়ু নীতির সাথে সংযুক্ত করে এবং জলবায়ু অভিযোজনের জন্য সংস্কৃতি-সংবেদনশীল ও স্থানীয়ভাবে পরিচালিত সমাধানগুলোকে উৎসাহিত করে।
