বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘সিটি গ্রুপ’ বর্তমানে গুরুতর আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, ডলারের মূল্যবৃদ্ধি, উচ্চ সুদহার এবং নতুন শিল্প প্রকল্পে বিপুল বিনিয়োগের ফলে প্রতিষ্ঠানটির ঋণের বোঝা প্রায় ২৬ হাজার ৬০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের ৩৬টি তফসিলি ব্যাংক এবং কয়েকটি বিদেশি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে গ্রুপটিকে পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে একটি কেন্দ্রীয় তদারকি ও ঋণ পুনর্গঠন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। কারণ সাধারণত কোনো প্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে পড়লে পৃথক পৃথক ব্যাংক নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সব ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত “ওয়াটারফল মেকানিজম” বা সমন্বিত ঋণ পুনর্গঠন মডেল হিসেবে।
কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাটি কীভাবে কাজ করবে?
প্রস্তাবিত ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হবে একটি এস্ক্রো অ্যাকাউন্ট। সিটি গ্রুপের প্রায় সব নগদ লেনদেন এই একক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়-ব্যয়ের ওপর ব্যাংকগুলোর সরাসরি নজরদারি থাকবে। কোনো অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে বা ঋণ পরিশোধে কত অর্থ ব্যবহার হচ্ছে, তা সহজেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
এছাড়াও নিম্নে উল্লিখিত পদক্ষেপসমূহ নিশ্চিত করা হবে –
ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিদের সিটি গ্রুপের পরিচালনা পর্ষদে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন করা হবে।
আন্তর্জাতিক মানের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান দ্বারা কোম্পানির আর্থিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হবে।
নগদ প্রবাহ, সম্পদ, দায় এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনার ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
এই ব্যবস্থায় ব্যাংকগুলো এককভাবে নয়, বরং সমষ্টিগতভাবে সিদ্ধান্ত নেবে। ফলে কোনো ব্যাংকের একতরফা পদক্ষেপ পুরো পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারবে না।
কেন প্রয়োজন হলো এই উদ্যোগ?
সিটি গ্রুপ শুধু একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাংলাদেশের ভোগ্যপণ্য, ভোজ্যতেল, আটা, ময়দা, চিনি, খাদ্যপণ্য এবং শিল্প উৎপাদন খাতের অন্যতম প্রধান অংশীদার। প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কারখানায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে।
যদি প্রতিষ্ঠানটি হঠাৎ করে দেউলিয়া হয়ে যায়, তাহলে কয়েকটি বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, এগুলো নিম্নরূপ –
১. ব্যাংকিং খাতে ধাক্কা
সিটি গ্রুপের ঋণ যদি খেলাপিতে পরিণত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর বড় চাপ সৃষ্টি হবে। কয়েকটি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতিও দেখা দিতে পারে।
২. কর্মসংস্থানের সংকট
হাজার হাজার শ্রমিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়বেন।
৩. সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন
দেশের খাদ্য ও ভোগ্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি হতে পারে।
৪. বিনিয়োগ পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হতে পারে।
এই কারণেই ব্যাংকগুলো প্রতিষ্ঠানটিকে সম্পূর্ণ ধ্বংস হতে না দিয়ে পুনরুদ্ধারের পথ বেছে নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এমন মডেলের নজির অনেক রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, দক্ষিণ কোরিয়া এবং সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে বড় করপোরেট সংকট মোকাবিলায় ঋণদাতা ব্যাংকগুলোর সমন্বিত পুনর্গঠন ব্যবস্থা ব্যবহৃত হয়েছে। বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় এটি “Corporate Debt Restructuring” বা “Syndicated Workout” নামে পরিচিত।
এ ধরনের মডেলের মূল দর্শন হলো—”বড় প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস না করে পুনরুজ্জীবিত করা, যাতে ঋণদাতা ও অর্থনীতি উভয়ই লাভবান হয়।”
কার্যকারিতা কতটা হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্যোগটির সফলতা নির্ভর করবে কয়েকটি বিষয়ের ওপর।
ইতিবাচক দিক
সব ঋণদাতা একই প্ল্যাটফর্মে আসছে।
অর্থ প্রবাহের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
স্বাধীন নিরীক্ষা ও তদারকি নিশ্চিত হবে।
ব্যবসা সচল রেখে ঋণ পুনরুদ্ধারের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ
ব্যাংকগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে।
ব্যবসার প্রকৃত আর্থিক অবস্থা প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ হলে পুনর্গঠন ব্যাহত হতে পারে।
বাজার পরিস্থিতি ও ডলারের মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত থাকলে নগদ প্রবাহ পুনরুদ্ধার কঠিন হতে পারে।
করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত না হলে আগের সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসতে পারে।
ভবিষ্যৎ কী?
সিটি গ্রুপ ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ, অপ্রধান ব্যবসা বিক্রি, কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনা, প্রাইভেট ইকুইটি বিনিয়োগ সংগ্রহ এবং কিছু ইউনিটকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, যথাযথ সহায়তা পেলে আগামী তিন বছরের মধ্যে তারা আর্থিক স্থিতিশীলতায় ফিরতে পারবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকও সাম্প্রতিক সময়ে সংকটাপন্ন কিন্তু সম্ভাবনাময় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বিশেষ পুনর্গঠন ও পুনঃতফসিল সুবিধা চালু রেখেছে, যা সিটি গ্রুপের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে সহায়তা করতে পারে।
সিটি গ্রুপকে ঘিরে ৩৬ ব্যাংকের এই সমন্বিত উদ্যোগ কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীকে বাঁচানোর চেষ্টা নয়; এটি বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত ও করপোরেট অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও বটে। উদ্যোগটি সফল হলে ভবিষ্যতে বড় শিল্পগোষ্ঠীর আর্থিক সংকট মোকাবিলায় একটি কার্যকর মডেল প্রতিষ্ঠিত হবে। আর ব্যর্থ হলে ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
তাই এটি শুধু সিটি গ্রুপের ভবিষ্যতের প্রশ্ন নয়, বরং বাংলাদেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং স্থিতিশীলতা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের ভবিষ্যতের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
শিশির পারিয়াল
প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক
চট্টগ্রাম মেইল।
