শনিবার, জুলাই ২৫, ২০২৬

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ : ‘পলিটিক্যাল মাস্টার স্ট্রোক’ অফ তারেক রহমান

শিশির পারিয়াল

অবশেষে গত কয়েকদিনের চলমান আলোচনা ও গুন্জনকে সত্য প্রমাণিত করে গতকাল শুক্রবার ২৪ জুলাই ২০২৬ ইং তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মহামান্য রাষ্ট্রপতির পদ হতে অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করলেন বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ও স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রেখে যাওয়া সর্বশেষ নিদর্শন জনাব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। এই পদত্যাগের মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশ সরকার স্বৈরাচারী শেখ হাসিনার নাগপাশ থেকে মুক্তি পেলো এটা বলাই যায়। আবার এই পদত্যাগের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের রাজনৈতিক বিজয় অর্জিত হয়েছে এটাও বলা যেতে পারে। অনেকেই প্রশ্ন করবেন কিভাবে? আসুন সেটারই ব্যবচ্ছেদ করা যাক।

গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণে সাবেক রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা 

রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন শেখ হাসিনার পলায়নের পর দেশের রাষ্ট্র কাঠামো সমুন্নত রাখতে এবং ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত আমাদের গৌরবের সংবিধানকে রক্ষা করায় সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাটি পালন করেছেন। যদি তিনি তথাকথিত ছাত্র জনতার দাবির মুখে এবং তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অসহযোগিতার সামনে অসহায় হয়ে পদত্যাগ করতেন তবে দেশে আদৌ আর কখনো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত হতো কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। তিনিই ছিলেন সংবিধান রক্ষার সর্বশেষে পিলার বা ভিত্তি যেটা ধ্বসে গেলে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের রক্তে রন্জিত সংবিধান বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা ছিলো। কিন্তু তিনি নিজের অবস্থানে অটল থেকে দেশে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান করার মাধ্যমে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের নিকট অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তরের পথ মসৃণ করেছেন। তদুপরি তিনি নির্বাচিত বিএনপি সরকারের সাথে সর্বপ্রকারের সহযোগিতা করেছেন এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন মন্ত্রীসভার সকল কাজের প্রতি শ্রদ্ধাশীলও থেকেছেন। অতএব জনাব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের রাষ্ট্রপতি পদ হতে একটি সম্মানজনক বিদায় প্রাপ্য ছিলো। এবং এখনো পর্যন্ত বলা যায় সেটি তিনি পেয়েছেন, যদি না ভবিষ্যতে তিনি ফ্যাসিস্টের সহযোগী হিসেবে দায় চুকাতে গিয়ে মামলার আসামি হয়ে পড়েন।

রাষ্ট্রপতির বিরোধিতা করতে গিয়ে বিরোধী দলের সংবিধান ও জাতীয় সংগীত অবমাননা 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পর সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বিএনপি ও জামায়াত – এনসিপি মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময় বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যগণ হট্টগোল করে এবং নজিরবিহীনভাবে হাতে ধরে প্লেকার্ড প্রদর্শন করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদের প্রতি চরম অমর্যাদা প্রদশর্ন করেন। এর মাধ্যমে বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা নিজেদের সংবিধান অমান্যকারী হিসেবে তুলে ধরেন। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত – এনসিপির সংসদ সদস্যরা জাতীয় সংগীতের অবমাননা করেন। যে কারণে পুরো দেশ জুড়ে নিন্দার ঝড় উঠে। যদিও পরবর্তীতে তাঁরা সাফাই দিয়ে বলেন জাতীয় সংগীতের আওয়াজ নাকি তাঁরা শুনতে পাননি। কিন্তু এটি বলেও জামায়াত – এনসিপির সংসদ সদস্যরা সংবিধান ও জাতীয় সংগীতের অমর্যাদা করার অভিযোগ হতে মুক্তি পাননি। এগুলো সবই সংসদের কার্য প্রণালীতে নথিভুক্ত করা আছে। এগুলোর ভিত্তিতে ভবিষ্যতে তাঁদের বিরুদ্ধে অনায়াসে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা দায়ের করা যাবে। এবং এই মহাশক্তিশালী অস্ত্রটি যে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াত – এনসিপির সংসদ সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করা হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা কিন্তু নেই।

নিজেদের সুবিধাজনক সময়ে রাষ্ট্রপতিকে পদত্যাগ করানো

বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই বিএনপির উপর জামায়াত ও এনসিপি ব্যাপক চাপ প্রয়োগ করে রাষ্ট্রপতি পদ হতে মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের জন্য। এবং বিএনপির নেতা কর্মীরাও রাষ্ট্রপতির অপসারণ চাচ্ছিলেন। কিন্তু সেটা করলে বিএনপির দুটো সমস্যা হতো। প্রথমত সরকারের মেয়াদ আর নতুন রাষ্ট্রপতির মেয়াদ প্রায় একই হয়ে যেতো। ফলশ্রুতিতে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির আস্থাশীল কেউ নাও থাকতে পারতো। দ্বিতীয়ত সবাই বলতো জনাব তারেক রহমান প্রতিহিংসার রাজনীতি করছেন এবং তিনি সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছেন। অতএব মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান রাষ্ট্রপতিকে নিজের সুবিধাজনক সময়ে অপসারণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তদুপরি এরই মধ্যে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন তাঁর সাংবিধানিক বক্তব্যে ও বিভিন্ন জায়গায় পলাতক ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের অপকর্মসমূহ তুলে ধরেন এবং তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমান্ডার শহীদ রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক হিসেবেও উল্লেখ করেছেন। নিঃসন্দেহে এটি বিগত পলাতক সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জনাব তারেক রহমানের একটি বিশাল রাজনৈতিক বিজয়। এবং অবশেষে রাষ্ট্রপতি জনাব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন বিএনপি সরকারের জন্য সুবিধাজনক সময়েই নিজ পদ ত্যাগের অভিমত পোষণ করলেন।

ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিএনপির রাজনৈতিক সুবিধা সমূহ 

জনাব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মেনে নিয়ে একটি সুবিধাজনক সময়ে তাঁকে পদত্যাগ করানোর মধ্যে দিয়ে বিএনপি বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক সুবিধা অর্জন করেছে যেগুলোর সুদূরপ্রসারী প্রভাব থাকবে।

প্রথমত, বিএনপি বলতে পারবে তারা সাংবিধানিক পদের অমর্যাদা করেনি আবার ফ্যাসিস্টের রেখে যাওয়া চিহ্নকে তারা বেশিদিন কপালে ধারণও করেনি।

দ্বিতীয়ত, পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপতি পদে বিএনপির আস্থাশীল কারো থাকার জোর সম্ভাবনা রয়েছে।

তৃতীয়ত, গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পলায়ন করা আওয়ামী সরকারের অপকর্মগুলোর উপর আওয়ামী আমলেই নিয়োগ পাওয়া রাষ্ট্রপতির সীলমোহর।

চতুর্থত, জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করতে গিয়ে জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা নিজেদেরকে সংবিধান ও জাতীয় সংগীতের অবমাননাকারী হিসেবে জাহির করা।

পঞ্চমত, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় উত্তরণে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তাঁকে মূল্যায়ন করা।

অতএব বলা যায় রাষ্ট্রপতির পদ হতে জনাব মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারপার্সন জনাব তারেক রহমানের ‘পলিটিক্যাল মাস্টার স্ট্রোক’।

 

শিশির পারিয়াল

প্রকাশক ও ব্যবস্থাপনা সম্পাদক

চট্টগ্রাম মেইল।

সম্পর্কিত খবর

চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাই শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা, শহীদ পরিবার ও আহত জুলাই যোদ্ধাকে সম্মাননা

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিএমইউ) উদ্যোগে জুলাই ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে শহীদদের স্মরণে আলোচনা সভা ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার কক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে জুলাই...

চট্টগ্রামে নিরাপত্তাকর্মী হত্যায় মামলা দায়েরের চার ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ৭

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম নগরীতে আবু সিদ্দিক নামের এক নিরাপত্তাকর্মী হত্যায় মামলা দায়েরের চার ঘন্টার মধ্যে এজাহারভু সাত ব্যক্তিকে আটক করেছে ডবলমুরিং থানা পুলিশ। শুক্রবার...

গণভোটের রায় না মানলে সরকারও মানা হবে না : সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান

ছবি : সংগৃহীত যে গণভোটের রায়ের ওপর ভিত্তি করে বর্তমান সরকার নিজেদের দাবি করছে, সেই রায় বাস্তবায়ন না করলে সরকারকেও মানা হবে না বলে হুঁশিয়ারি...

দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসনে কাজ শুরু করেছে সরকার : সাঈদ আল নোমান এমপি

চট্টগ্রাম : চট্টগ্রাম ১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান বলেছেন, সাম্প্রতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সরকার শুধু ত্রাণ বিতরণেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং...

একনেকে ১৪ হাজার কোটি টাকার ৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন

ছবি : সংগৃহীত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রায় ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ের আটটি উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন চূড়ান্ত করেছে। এর...

‘জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পূর্তি’ উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের ৫ মাসের কার্যক্রম তুলে ধরছেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন। ছবি : সংগৃহীত   দায়িত্ব গ্রহণের ১৫০ দিন বা পাঁচ মাস পূর্তি উপলক্ষে...
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত