পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা নিয়ে আমেরিকার অবস্থান হঠাৎ বদলে যাওয়ায় আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনকে কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। তাঁর অভিযোগ, যে আমেরিকা এতদিন বিভিন্ন দেশকে রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছিল, এখন তারাই আবার ভারত-সহ একাধিক দেশকে রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কিনতে অনুরোধ করছে।
সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে আরাঘচি সরাসরি ওয়াশিংটনের নীতিকে ‘ভণ্ডামি’ বলে কটাক্ষ করেছেন। তাঁর কথায়, গত কয়েক মাস ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ভারত-সহ বিভিন্ন দেশকে রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছিল। কিন্তু ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গেছে। এখন হোয়াইট হাউস বিশ্বজুড়ে দেশগুলিকে, বিশেষ করে ভারতকে রাশিয়ার তেল কিনতে অনুরোধ করছে বলে দাবি করেছেন তিনি। ইরানের বিদেশমন্ত্রীর বক্তব্য, পশ্চিম এশিয়ায় মাত্র ১৪ দিনের সংঘাতই আমেরিকার অবস্থানকে এমন জায়গায় এনে দিয়েছে যে তারা এখন কার্যত অন্য দেশগুলির কাছে অনুরোধ করতে বাধ্য হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এই ঘটনাই প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমেরিকার দ্বিচারিতা কতটা স্পষ্ট।”
এই বিতর্কের মূল কারণ পারস্য উপসাগরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ হরমুজ প্রণালী। ইজরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলার জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠার পর ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহণ রুটে অয়েল ট্যাঙ্কারের চলাচল বন্ধ করে দেয় বলে আন্তর্জাতিক মহলে দাবি উঠেছে। ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। হরমুজ প্রণালী বিশ্ব তেল বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ। মধ্যপ্রাচ্যের বিপুল পরিমাণ তেল এই রুট দিয়েই আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছে। এই রুটে বিঘ্ন ঘটায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায় এবং ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলারের উপরে উঠে যায় বলে বিভিন্ন বাজার বিশ্লেষকদের অনুমান।
এই পরিস্থিতি সামাল দিতেই আমেরিকা নীতিগত ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে। মার্কিন প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সমুদ্রে আটকে থাকা রাশিয়ার তেল কেনার ক্ষেত্রে ভারত-সহ কয়েকটি দেশকে ৩০ দিনের জন্য সাময়িক অনুমতি দেওয়া হয়েছে। উদ্দেশ্য, বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা। এই বিষয়ে মন্তব্য করেছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। তাঁর মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি বাজারে সাময়িক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তাই সরবরাহ বজায় রাখতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, বর্তমানে সমুদ্রে আটকে থাকা তেল কেনার অনুমতি দিলে বাজারে সরবরাহ কিছুটা বাড়বে এবং দামের ওপর চাপ কমবে।
তবে আমেরিকার এই নীতিবদল নিয়ে সমালোচনা শুধু ইরানের তরফ থেকেই আসেনি। ইউরোপের একাধিক দেশও এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। তাদের আশঙ্কা, রাশিয়ার ওপর চাপ কমিয়ে দিলে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ চলাকালীন মস্কোর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার প্রভাব দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। ইরানের বিদেশমন্ত্রী অবশ্য এখানেও ইউরোপকে ছেড়ে কথা বলেননি। তাঁর অভিযোগ, ইউরোপীয় দেশগুলি ইরানের বিরুদ্ধে ‘অবৈধ যুদ্ধ’ সমর্থন করেছিল এই ভেবে যে তাতে রাশিয়ার বিরুদ্ধে আমেরিকার সমর্থন পাবে। কিন্তু বাস্তবে সেই হিসেব ভেস্তে গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।
