ব্রাজিল ০ : ২ নরওয়ে
নিউ জার্সির মেট লাইফ স্টেডিয়ামে শেষ ষোলোর লড়াইয়ে নরওয়ে ২-১ গোলে জিতে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছে ৫ বারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে। দ্বিতীয়ার্ধে ১১ মিনিটের ব্যবধানে জোড়া গোল করে স্ট্রাইকার হলান্ডই হচ্ছেন নরওয়ের এই সাফল্যের মূল নায়ক আর ম্যাচ জুড়ে দুর্দান্ত সব সেভ করে পার্শ্বনায়ক অবশ্যই গোলরক্ষক আরিয়ান হশল নিলাদ। চলতি আসরের আগে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে নরওয়ের কোনো জয় ছিল না, তারাই এবার জিতল টানা দুটি ম্যাচ। প্রথমবারের মতো উঠল কোয়ার্টার-ফাইনালে।
চোট কাটিয়ে পূর্ণ ফিটনেস পাওয়ার লড়াইয়ে থাকা নেইমার দলকে উদ্ধার করতে মাঠে নামলেন, কিন্তু পারলেন না দলকে বাঁচাতে। শেষ দিকে পেনাল্টি থেকে জালের দেখা অবশ্য পেলেন তিনি, কিন্তু ততক্ষণে খেলার ফলাফল পরিবর্তন হওয়ার কোনো সুযোগই ছিলোনা। কেবল ৩০ শতাংশের একটু বেশি সময় পজেশন রেখে গোলের জন্য ১৪টি শট নিয়ে চারটি লক্ষ্যে রাখতে পারে ব্রাজিল। নরওয়ের ৯ শটের পাঁচটি ছিল লক্ষ্যে।
ভয়ডরহীন নরওয়ে কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে, তারই একটা ইঙ্গিত যেন মেলে ম্যাচের শুরুতেই। তৃতীয় মিনিটে গতিময় আক্রমণে ডি-বক্সের মুখ থেকে জোরাল শটে জালে বল পাঠান পাত্রিক বার্গ, তবে অফসাইডের পতাকা ওঠায় সেই যাত্রায় বেঁচে যায় ব্রাজিল। সাত মিনিট পর অন্য পাশে দারুণ এক আক্রমণ শাণায় ব্রাজিল। গোলের সুবর্ণ সুযোগও পায় তারা; কিন্তু সফল হতে পারেনি। তবে ডি-বক্সে মাতেউস কুইয়াকে ফাউল করেন ডিফেন্ডার ক্রিস্তোফের আয়ের। শুরুতে রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলেও, ভিএআরের পরামর্শে মনিটরে দেখে পেনাল্টি দেন রেফারি। প্রথমে ভিনিসিউস জুনিয়র শট নেবেন মনে হলেও, শট নেন ব্রুনো গিমারাইস এবং তার নিচু স্পট কিক ঝাঁপিয়ে রুখে দেন আরিয়ান হশল নিলাদ।
বেশিরভাগ সময় পজেশন রেখে বাররার আক্রমণে উঠলেও, উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারছিল না নরওয়ে। ৩৫তম মিনিটে গোলের জন্য প্রথম বৈধ শট নিতে পারে তারা; তবে মার্টিন ওদেগোরের শটটি পাশের জাল কাঁপায়। দুই মিনিটের মধ্যে লক্ষ্যে প্রথম শট নেন হলান্ড, যদিও তার দুর্বল ভলি জমে যায় আলিসনের গ্লাভসে। খানিক পর ডি-বক্সে দুজনকে কাটিয়ে শট নেন ভিনিসিউস, পা দিয়ে আটকান নিলাদ। প্রথমার্ধের ছয় মিনিট যোগ করা সময়ে দুই দলই এগিয়ে যাওয়ার পরিষ্কার সুযোগ পায়।
প্রথমে ডি-বক্সে ব্রাজিলের দুই ডিফেন্ডার হলান্ডকে আটকাতে গিয়ে বল হারিয়ে ফেলে এবং আলগা বল ধরে শট নেন ওদেগোর, ঝাঁপিয়ে কোনোমতো আটকান আলিসন। পাল্টা আক্রমণে ছয় গজ বক্সে অসাধারণ এক ক্রস বাড়ান কাসেমিরো, অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে বলের লাইনে পৌছেও যান গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি, কিন্তু বলে মাথা ছোঁয়াতে পারেননি তিনি।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিটে দারুণ কয়েকটি সুযোগ তৈরি করে ব্রাজিল, কিন্তু প্রতিবারই ব্যর্থতা হয় সঙ্গী। এই সময়ে সবচেয়ে সহজ সুযোগটি পান ৫৮তম মিনিটে কুইয়ার বদলি নামা এন্দ্রিক। পরের মিনিটেই প্রতি-আক্রমণে বাঁ দিক থেকে ডি-বক্সের বাইরে দুর্দান্ত এক থ্রু বল বাড়ান ভিনিসিউস। বল ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণেও নেন তরুণ ফরোয়ার্ড; কিন্তু ওয়ান-অন-ওয়ানে এগিয়ে আসা গোলরক্ষকের চ্যালেঞ্জের মুখে লক্ষ্যভ্রষ্ট শট নেন তিনি। তিন মিনিট পর আবার গোলরক্ষকের নৈপুণ্যে রক্ষা নরওয়ের। ডি-বক্সের মুখ থেকে হায়ানের শট দারুণ ক্ষিপ্রতায় রুখে দেন নিলাদ। পরের কয়েক মিনিটে ভালো দুটি আক্রমণ করে নরওয়ে, যদিও আলিসনের তেমন পরীক্ষা নিতে পারেনি কেউ।
এরপরই, ৬৭তম মিনিটে জোড়া পরিবর্তন করেন আনচেলত্তি; মার্তিনেল্লি ও হায়ানকে তুলে নেইমার ও দানিলো সান্তোসকে নামান কোচ যদিও তার কোনো ফল আসেনি। ৭৯তম মিনিটে স্বরূপে হাজির হন হলান্ড এবং বাঁ দিক থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরিপের ক্রস ছয় গজ বক্সের বাইরে পেয়ে, সবার ওপরে লাফিয়ে হেডে ব্রাজিলকে হতভম্ব করে দেন দিনি। তার পাশেই ছিলেন গাব্রিয়েল মাগালাইস, কিন্তু তিনি পারেননি প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। জাতীয় দলের হয়ে টানা ১৪টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে জালের দেখা পেলেন হলান্ড। অষ্টম ইউরোপিয়ান ফুটবলার হিসেবে বিশ্বকাপে নিজের প্রথম চার ম্যাচে গোল করার কীর্তি গড়লেন ম্যানচেস্টার সিটির এই স্ট্রাইকার।
পরের পাঁচ মিনিটে আরও দুটি দারুণ সেভ করেন নিলাদ। এন্দ্রিকের শট আয়েরের পায়ে লেগে ক্রসবার ঘেঁষে জালে জড়াতে যাচ্ছিল, অসাধারণ ক্ষিপ্রতায় সেটা রুখে দেন নিলাদ। এরপরই, নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে ব্রাজিলের ঘুরে দাঁড়ানোর আশা শেষ করে দেন হলান্ড। ডি-বক্সের বাইরে থেকে, আচমকা নিচু জোরাল শটে আলিসনকে পরাস্ত করেন তিনি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে এই নিয়ে সবশেষ ১৪ ম্যাচে ২৭টি গোল করলেন হলান্ড। আজকের খেলায় হল্যান্ডের জোড়া গোলের মাধ্যমে চলতি আসরে গোল্ডেন বুটের ও গোল্ডেন বলের লড়াইটা জমে উঠল আরও। কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসির সমান সাতটি গোল করলেন হলান্ড।
