ফুটবল এখনো কাঁদাতে পারে মেসিকে !
কান্নার অনেক রং! যার অন্তত দুটি রং গত তিন দিনে দেখেছে বিশ্বকাপ ফুটবল। তিন দিনে ফুটবল ইতিহাসের তিনজন ফুটবলার কাঁদলেন। নেইমার ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পর গতকাল কাঁদলেন লিওনেল মেসিও।বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফি হাতে নিয়েও এমন কান্না দেখিনি।
নেইমার ও রোনালদোর কান্না ছিল হৃদয় ভাঙার, আর মেসি কাঁদলেন ঘুরে দাঁড়ানোর আনন্দে। খাদের কিনারা থেকে অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তনের পর মেসির দুচোখ যেন বাঁধ ভেঙেছে। শেষ কবে মেসিকে এভাবে কাঁদতে দেখেছিল কেউ!

ম্যাচের ৭৮ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা দুই গোলে পিছিয়ে ছিল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এর আগে কোনো দল এত দেরি পর্যন্ত দুই গোলের বেশি পিছিয়ে থেকেও অতিরিক্ত সময়ে না গড়িয়ে ম্যাচ জিততে পারেনি।তবু যে মাঠে একজন অন্য গ্রহের ফুটবলার আছেন যার নাম মেসি। তার থাকা মানে যেকোনো সময় ফুটবল দর্শকদের আশা কিছু ঘটে যাওয়া মাঠে । মাঠে খুব শান্ত খুব কম দৌড়াদৌড়ি আর পায়ে বল আসা মাত্র গতি ড্রিবলিং ছন্দময় পাস কাটানো মেসির স্বভাবজাত খেলা। এ যেন এক পা ম্যারাডোনার আরেক পা পেলের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এক জাদুকরী খেলোয়াড়। মেসিকে সাধারণত দিয়ে গোল করতে খুব একটা দেখা যায় না কিংবা চোখে পড়েনি। বাঁ পায়ের অসাধারণ দক্ষতার সাথে বল রিসিভ করে নিখুঁত শট যেন মেসির খেলার মাঠে নিত্যদিনের দৃশ্য। আর ডান ও বাঁ পায়ে অ্যাসিস্টে সমান দক্ষতা মেসিকে নিয়ে গেছে অন্য উচ্চতায়।এরপর শুরু হলো একার যুদ্ধ। একা টেনে নিয়ে চললেন পুরো দলটাকে। সময় ফুরিয়ে আসছে, মিশরের দেয়াল ভাঙছে না। তারপর সেই মুহূর্ত, তাঁর ক্রসে যে আক্রমণ শুরু, তা শেষ হল তাঁর পায়েই। ফিরতি বলে জোরালো শটে জাল কাঁপিয়ে দিলেন। আর গোটা আর্জেন্টিনা যেন কবর থেকে ফিরে এল। ২-২। যে সমতার ভূমিতে দাঁড়িয়ে জয় সম্ভব হলো।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন? চার বছর আগে কাতারে যে মানুষটি ফুটবলের সঙ্গে সব লেনদেন মিটিয়ে ফেলেছিলেন, তিনি কেন শেষ ষোলোর একটি ম্যাচ জিতে এভাবে কাঁদছেন? তবে কি এখনো শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের ‘কিছু মায়া রয়ে গেলো’ কবিতায় বলা—‘জ্বালাহীন হৃদয়ের একান্ত নিভৃতে/ কিছু মায়া রয়ে গেলো দিনান্তের’ কথাগুলোর মতো সত্যিই কিছু মায়া রয়ে গেল?

ফলে এটুকু বলা যায়, ফুটবল এখনো মেসিকে কাঁদাতে পারে। মুখে যতই ‘নির্বাণ’ লাভের কথা বলা হোক, সত্যি কথা হচ্ছে মেসির জীবনে এখনো ফুটবল চার বছর আগের মতো প্রাসঙ্গিক। আর তাই তো ম্যাচ শেষে সতীর্থরা মেসিকে শূন্যে ছুড়ে মাতলেন উদ্যাপনের আনন্দে। মেসি এই বিশ্বকাপে আগেও কেঁদেছেন। বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে প্রথম গোলের পর মেসিকে কাঁদতে দেখে অবাক হয়েছিল অনেকেই। পরে জানা গিয়েছিল বাবার অসুস্থতার কারণেই তাঁর এমন কান্না। গতকাল রাতের কান্নার পেছনেও থাকতে পারে অন্য কোনো কারণ। কিন্তু কান্নাটা যে মিসরের বিপক্ষে হারতে হারতে পাওয়া জয়ের আবেগ থেকে উৎসারিত, তা তো আর মিথ্যা নয়।
শেষ বাঁশি বাজল। সমর্থকরা হাসলেন, আর এই হাসিটুকু ফিরিয়ে দিতে পেরে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়লেন। চাপ, অপরাধবোধ, দায়মুক্তির স্বস্তি সব একসাথে নেমে এল চোখ বেয়ে।

ভেবেছিলাম আমিই দলকে ডুবিয়ে দিলাম, ম্যাচ শেষে মেসি।শেষ হয়নি ফুটবলের প্রতি মেসির মায়াও। মেসি কাঁদুক আরও অনেক আনন্দের কান্না। ঘুমই আসলো না, রাতটা কাটলো অবশেষে। মনে হল হাজার বছরের পুরানো একটা রাত। আকাশে মেঘ, তবুও নীল সাদা পতাকাটা স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে। যেরকম স্পষ্ট চোখে ভাসছে আজকের ম্যাচ। অবিশ্বাস্য আর্জেন্টাইন প্লেয়াররা, অবিশ্বাস্য ফিরে আসা, অবিশ্বাস্য একটা ম্যাচ।
