বাংলার সুফি ঐতিহ্যের ইতিহাসে কিছু মহিমান্বিত নাম রয়েছে, যাঁরা প্রচারের কোলাহলের মধ্যে নয়, নীরব সাধনার দীপ্তিতে মানুষের অন্তরে স্থায়ী প্রভাব ফেলেছেন। হযরত শাহ সুফি সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) ছিলেন সেই আলোকিত ব্যক্তিত্বের মধ্যে একজন। যিনি ‘সৈয়দ সাহেব’ ও ‘পীর সাহেব’ নামে পরিচিত।
আল্লাহর প্রতি অটল ঈমান, রাসুল (সা.)-এর আদর্শ অনুসরণ এবং আত্মশুদ্ধির অনবরত সাধনা ছিল তাঁর জীবনদর্শনের মূল ভিত্তি।তাঁর জীবন ছিল আত্মনিবেদন, সংযম ও অন্তরশুদ্ধির এক শান্ত অথচ দৃঢ় সাধনা। যদিও তিনি প্রচারবিমুখ ছিলেন, তবুও তাঁর প্রভাব ছিল গভীর ও বিস্তৃত। মানুষের বাহ্যিক পরিচয়ের চেয়ে অন্তরের অবস্থাকেই তিনি বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন জীবনের প্রকৃত সফলতা নিহিত রয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি পূর্ণ আত্মসমর্পণ এবং আত্মার পরিশুদ্ধিতে। মানুষের অন্তরকে পবিত্র করা, নৈতিক দৃঢ়তা গড়ে তোলা এবং আল্লাহমুখী জীবনযাপন প্রতিষ্ঠা করাই ছিল তাঁর শিক্ষার মূল লক্ষ্য। এছাড়াও, তিনি মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন শুধুমাত্র বাহ্যিক আমলের দিকে নয়, বরং অন্তরের সংশোধন ও চরিত্রের পরিশোধনের মাধ্যমে পূর্ণতা অর্জনের পথে এগিয়ে আসতে।
পারিবারিক পরিবেশেই তিনি জাহেরি (শরিয়তভিত্তিক) এবং বাতেনি (আধ্যাত্মিক) উভয় ইলমে দীক্ষিত হন। এই সমন্বিত শিক্ষা তাঁর চিন্তা, আচরণ ও উপদেশে স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি ক্বালবের পরিশুদ্ধিকে ধর্মচর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মনে করতেন এবং বাহ্যিক ইবাদতের সঙ্গে অন্তরের সচেতনতা ও আত্মজাগরণকে অপরিহার্য বলে দেখতেন। তাঁর মুখনিঃসৃত বাণীগুলো সংক্ষিপ্ত হলেও গভীর অর্থবহ। “আমার চাষ আসমানে” এই বাক্যেই তিনি দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহ অতিক্রম করে আখিরাতমুখী জীবনদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বংশপরিচয়ের দিক থেকে তিনি ছিলের আহলে বাইতের বংশধর পীরানে পীর দস্তগীর গাউছুল আজম হযরত সৈয়দ আবদুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর বংশের। তাঁর পূর্বপুরুষরা বাগদাদ শরীফ থেকে এ অঞ্চলে আগমন করে ধর্মপ্রচার ও তাসাউফের সুদৃঢ় ভিত্তি স্থাপন করেন। এই ধারার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন বাগদাদ শরীফের কুতুবে আকতাব আবদাল হযরত মাওলানা সৈয়দ নুর উদ্দিন (রহ.), তাঁর পুত্র পীরে কামেল সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন (রহ.), উনার সন্তান মাওলানা সৈয়দ ইমাম উদ্দিন (রহ.) এবং তাঁর সন্তান সৈয়দ সিদ্দিক আহমদ (রহ.)। এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই সৈয়দ আবুল ওলা (রহ.) আত্মপ্রকাশ করেন এবং নিজের জ্ঞান, সাধনা ও আধ্যাত্মিক অনুশীলনের মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব বিস্তার করেন। বর্তমানে তাঁর পুত্র সৈয়দ ফখর উদ্দিন এই বংশপরম্পরার আধ্যাত্মিক ধারা অব্যাহত রেখেছেন।
সৈয়দ আবুল ওলা (রহ) ২২শে শাবান ১৪২০ হিজরি সনে ইন্তেকাল করেন। তাঁর মাজার চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার জোরারগঞ্জ থানাস্থ ইছাখালী ইউনিয়নের সাহেবদীনগর গ্রামস্থ সৈয়দ সাহেবের বাড়িতে অবস্থিত। সৈয়দ আবুল ওলা (রহ) এর জীবন, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক দর্শন মানুষের অন্তরকে আলোয় উদ্ভাসিত করছে।
